দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পেল স্পেন। গতকাল সোমবার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোজারা। এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল স্পেন। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করল তারা। ২০২২ থেকে
দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পেল
স্পেন। গতকাল সোমবার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে
২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোজারা।
এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল স্পেন।
এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করল তারা।
২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গত ৫ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত
বিশ্ব ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় স্পেন ১৬টি শিরোপা জিতেছে। এর মধ্যে নারী ফুটবলে
এসেছে ১১টি এবং পুরুষ ফুটবলে ৫টি ট্রফি।
কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে শুরু করা বিশ্বকাপে এই স্পেনকে দেখে বিস্ময়
জেগেছিল। কিন্তু বদলে গেল তারা। একের পর এক জয়, আর গোলপোস্ট অক্ষত রেখে ফাইনালে ওঠে
আসে লা রোজারা। সোমবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে শুরুটা হতাশার হলেও
শেষটা একেবারে অবিশ্বাস্য। ফাইনালে বিশ্বকাপের হট ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে কোনো রকম
পাত্তা না দিয়েই চ্যাম্পিয়ন হলো স্পেন। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি
জিতল তারা। ১০ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতে ইউরোপের পর বিশ্বজয় করল
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
দারুণ সব প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফাইনালে একেবারে হতাশ করল আর্জেন্টিনা। মাত্র ৩৫
শতাংশ বল দখলে রেখে লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে পারেনি তারা। ১২০ মিনিট খেলে পুরো
ম্যাচে ছড়ি ঘুরিয়েছে স্পেন। নির্ধারিত সময়ে তাদের জয় না পাওয়া ছিল দুর্ভাগ্যজনক।
১০টি সেভে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিতে বড় অবদান রাখেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার
এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। কিন্তু পারেননি অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের গোল ঠেকাতে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে তো বটেই, অতিরিক্ত
সময়েও লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের শুরু থেকে স্পেনের দাপুটে শুরু। ইয়ামাল ৫ মিনিটে প্রায় স্পেনকে এগিয়ে
নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম বড় সুযোগটি পায় লা রোজা। ইয়ামাল বক্সে
ক্রস বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে ওলমোর কাছে চলে যায়। ওলমো
দারুণভাবে বলটি আবার তার দিকেই বাড়িয়ে দেন। ইয়ামাল বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। কিন্তু
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বলটি জালে জড়াতে পারেনি!
ওয়ারজাবাল চমৎকার এক ফ্লিকে পোরোর উদ্দেশে বল বাড়িয়েছিলেন। তাকে ম্যাক অ্যালিস্টার
ফাউল করে ফেলে দেন। কিন্তু রেফারি স্লাভকো ভিনসিক ফাউলের সেই আবেদন নাকচ করে দেন!
দুই দলের মধ্যে স্পেনই শুরুটা ভালো করেছে, তবে আর্জেন্টিনাও ভীতি ছড়ায়। এর ঠিক
কিছুক্ষণ আগে ৭ মিনিটে সিমন দ্রুত নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে মেসিকে নিশ্চিত
গোলের সুযোগ পাওয়া থেকে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন!
স্পেন তাদের আক্রমণের চাপ আরও বাড়ায়। ৩৯ মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনা নিজেদের
মধ্যে দারুণ বোঝাপড়ায় বল দেওয়া-নেওয়া করেন। এরপর ফাবিয়ান আলতো টোকায় বল বাড়িয়ে দেন
ওয়ারজাবালের দিকে। তিনি বক্সের প্রান্ত থেকে প্রথম সুযোগেই বাম পায়ের এক জোরালো শট
নেন। কিন্তু মার্টিনেজ নিচে নেমে এসে দারুণভাবে বলটি রুখে দেন।
৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর ইনজুরির লক্ষণ নিয়ে তিনি নিকোলাস ওতামেন্দির
বদলি হন। পর্তুগাল ম্যাচের পর থেকে স্পেনের প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় ইনজুরি
নিয়ে মাঠ ছাড়লেন। একই সময়ে কুকুরেয়ার দারুণ একটি প্রচেষ্টা ডানপাশের পোস্টের সামনে
দিয়ে মাঠের বাইরে যায়।
হাফটাইমের আগে ৬৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা।
লক্ষ্যে লা রোজারা শট রেখেছে দুটি। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন।
আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩! পুরোটা সময় লক্ষ্যে তো বটেই,
কোনো শট নিতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন দুইবার
ক্লিয়ার সুইপ করে তাদের প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেন। স্পেন ফাইনাল থার্ডে ৩৫ বার
ঢুকেছে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।
দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন দলে। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ
পাওয়া নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে নামান লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয়
মিনিটে স্পেন ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। ওয়ারজাবালের পাস ধরে বায়েনা শট নেন। তার
দুর্বল শট মাটিতে লাফিয়ে মার্টিনেজের হাতে পড়ে।
বিরতির পর মাঠে নামার পর থেকেই পারদেসের জন্য এই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুটা যেন একটি
দুঃস্বপ্নের মতো হয়েছে! তিনি অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন এবং এই ঘটনার জন্য
তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এই সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে
ঘিরে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকল! স্পেন ফাবিয়ানের মাধ্যমে পেছন থেকে
পাল্টা আক্রমণ করে। বলটি ওয়ারজাবালের কাছে পৌঁছালে তিনি ফাবিয়ানকে পাস দেন। তিনি
শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে বলটি পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওতামেন্দি
এগিয়ে এসে বলটি বিপদমুক্ত করেন!
পরের মিনিটে আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার বক্সের
ডানপ্রান্ত থেকে ওলমোর ব্যাকপাস গোলপোস্টের সামনে কুকুরেয়ার পায়ে পড়ার আগেই গঞ্জালো
মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন। দুই মিনিট পর নাহুয়েল মলিনাকে তার বদলি মাঠে নামান
স্কালোনি।
৬২ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের
পরিবর্তে ফেরান তোরেস মাঠে নামেন। দুই মিনিট পর ওলমোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট
রুখে দেন মার্টিনেজ। তিনি বল ধরে রাখতে না পারলেও মাঠের বাইরে যায়।
আর্জেন্টিনার ডানপ্রান্ত থেকে ইয়ামাল দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করে দেন। আলভারেজ ও
ম্যাকঅ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলে বাইলাইন থেকে বার্সা তারকার বাঁ পায়ের ক্রস। তোরেস
নিচু হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজের হাতে পড়ে বল।
৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনেন। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলকে তুলে নিয়ে
ফরোয়ার্ড জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামায় তারা। আর ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ডিফেন্সে
জায়গা পান ফাকুন্দো মেদিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ওলমোর জায়গায় মিকেল
মেরিনো ও বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস আসেন।
দুই মিনিট পর গোল করার মতো জায়গা থেকে পেদ্রির শট মার্টিনেজের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট
হয়। কয়েক মুহূর্ত পর ইয়ামালের দারুণ এক প্রচেষ্টা মেদিনা ব্লক করেন। তবে বল পড়ে
কুবারসির পায়ে। দূর থেকে তার নেওয়া শট দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্টিনেজের গায়ে লেগে
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে ব্যাকপোস্টে আইমেরিক লাপোর্তের দুর্বল
হেড তিনি রুখে দেন। ৮৭ মিনিটে তোরেসের একটি শট গোলবারের পাশ দিয়ে যায়।
ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আর্জেন্টাইন
কিপার। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবার্সিকে ফাউল
করেন তিনি। শেষ মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বক্সের সামনে থেকে তার
নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জাল কাঁপায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস গোল করেন।
কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ৯৬ মিনিটে স্পেন ভেবেছিল তারা এই
বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গিয়েছে! বল স্পর্শ করার জন্য ইয়ামালের প্রচেষ্টা মেরিনোর
কাছে পৌঁছায়। তিনি ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করে শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ তা
ব্লক করেন!
উইলিয়ামস আলগা বলটি লুফে নিয়ে জালে জড়ান। কিন্তু রেফারি ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর
ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন! অবশ্যই ভিএআর এটি পরীক্ষা করে দেখে গোল বাতিলের
সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর কিছুক্ষণ পর দারুণ এক গোলে স্পেনকে এগিয়ে দিলেন তোরেস।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে উইলিয়ামসের শট
পোস্টে লেগে ফিরে এলে তিনি জালে বল জড়িয়ে দেন। ফাইনালে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে
গোল করলেন তোরেস। সবশেষ ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের গোলে হার দেখেছিল আর্জেন্টিনা।
১১৩ মিনিটে আরেকবার গোল করেছিলেন তোরেস। কিন্তু তিনি অফসাইডে থাকার কারণে গোলটি
বাতিল হয়। ১২০ মিনিটে মেরিনো ও কুবার্সির প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার একটি গোলের সুযোগ
নষ্ট হয়। মেসির ফ্রি কিক থেকে গোলমুখের সামনে সিমিওনে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি।
কিছুক্ষণ পর তার আরেকটি শট গোলবারের উপর দিয়ে যায়। তারও আগে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের
একটি রকেট গতির শট গোলমুখের সামনে থাকা মিকেল মেরিনোর মুখে লেগে ব্যর্থ হয়।
রেকর্ড সেভ ও ৮০০ পাসে আর্জেন্টিনার স্বপ্নভঙ্গ
নির্ধারিত সময়ে কষ্টার্জিত ড্রয়ের পর স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারল আর্জেন্টিনা।
ইউরোপিয়ান দলটি জিতে নিলো বিশ্বকাপ ট্রফি। জয়টা ছোট ব্যবধানে হলেও পরিসংখ্যান বলছে,
লিওনেল স্কালোনির দলের ওপর স্প্যানিশরা পুরোপুরি ছড়ি ঘুরিয়েছে।
বল দখলে রেখে ম্যাচে আধিপত্য করা স্পেনের জন্য নতুন কিছু নয়। ফাইনালেও তার
ব্যতিক্রম হলো না। ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল তারা। এর মধ্যে সফল পাস ছিল ৮৫২টি,
আর্জেন্টিনার (৪৬৪) চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৭৬২ পাস ছিল নিখুঁত। বলাবাহুল্য,
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরোপুরি ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
সত্যি হলো স্পেনের পারফরম্যান্স কেবল বল দখল ও পাসিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।
আর্জেন্টিনার গোলে তাদের শট ছিল ২০টি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ১১টি সেভ করেন, যা
বিশ্বকাপ ফাইনালে একজন গোলকিপারের রেকর্ড।
বিপরীতে স্কালোনির দল মাত্র দুটি শট নিয়েছিল গোলে। অবশ্য দুটি ক্ষেত্রেই স্প্যানিশ
কিপার উনাই সিমনকে তেমন কিছু করতে হয়নি। এই প্রচেষ্টাগুলোই আর্জেন্টিনাকে শেষ দিকে
বেঁচে থাকার আশা জাগিয়েছিল।











