ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধ এবং অর্থনীতি সচল করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজকালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এই তথ্য

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধ এবং অর্থনীতি সচল করার লক্ষ্যে

এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। সব

জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজকালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল

প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

এক্সে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আর চুক্তি সই হতে পারে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, চুক্তিটি যদি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের

সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈরী

সম্পর্কের অবসান ঘটাতে এমন একটি চুক্তি সত্যিই ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে গণ্য হবে। এটি

একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ সুগম করবে, অন্যদিকে বিশ্ব বাজারে

জ্বালানি তেল ও অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত

বদলাতে শুরু করেছে। দুই দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে নেপথ্যের নায়ক ও প্রধান

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য

বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক সব চুক্তির দেশ হিসাবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভা

ভেন্যু হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

নেপথ্যের নায়ক পাকিস্তান: দুই চিরবৈরী দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে প্রধান

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার

পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।

প্রস্তুত জেনেভা: সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক চুক্তির শহর

হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে ভেন্যু হিসেবে প্রস্তুত করার প্রস্তাব

দেওয়া হয়েছে। নতুন সমীকরণ: এই চুক্তির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ

প্রণালী’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ‘লেবানন’ নিয়ে নতুন সমীকরণ

তৈরি হচ্ছে।

ইসরায়েলে তোলপাড়: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য চুক্তির খবরে ইসরায়েলি শিবিরে

চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনায়

গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ডিজিটাল স্বাক্ষর ও দুই ধাপের শান্তি প্রক্রিয়া: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ

জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এতে ‘ইলেকট্রনিক

স্বাক্ষর’ বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই করবেন। এরপর আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে কারিগরি

ও কৌশলগত পর্যায়ের দীর্ঘ আলোচনা। এই শান্তি আলোচনা সফল করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর

সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আন্তরিকতার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে শাহবাজ

শরিফ বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে

স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য

চুক্তির পুরো কাঠামো ও ব্লুপ্রিন্ট বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

আরাগচি জানান, পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি মূলত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে আগামী এক

বা দুই দিনের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রাথমিক চুক্তি

সই হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা ইরানের সমস্ত

আর্থিক সম্পদ একযোগে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যা প্রায় ৬০ দিন

স্থায়ী হবে এবং এই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উভয় পক্ষ

টেবিলে বসবে।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

স্পষ্ট করেছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং সামগ্রিক পারমাণবিক ইস্যুটিকে কৌশলেই

প্রথম ধাপ থেকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার জন্য তোলা রাখা হয়েছে। আমেরিকা

চেয়েছিল ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিক, কিন্তু ইরান তাদের

অবস্থানে অনড়। আরাগচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের

বাইরে পাঠানো হবে না, বরং তা ইরানের ভেতরেই তরল করা হবে এবং এটাই একমাত্র উপায়।

দ্বিতীয় ধাপের ৬০ দিনের আলোচনায় আমেরিকার আরোপিত সব অবৈধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা

চিরতরে প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। যদি ৬০ দিনের মধ্যে

চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব না হয়, তবে পুরো পরিস্থিতি আবার আগের যুদ্ধকালীন অবস্থায় ফিরে

যাবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।

রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে আরাগচি বলেন, আমেরিকা-ইসরায়েলের অত্যাধুনিক

ও পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এই অন্যায় যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হিসেবে

আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের কূটনীতি মূলত রণাঙ্গনের এই বিজয়কে চুক্তির মাধ্যমে

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে মাত্র। এই চুক্তির প্রথম শর্তই হচ্ছে ইরানের ওপর আমেরিকার

দেওয়া অবৈধ নৌঅবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে

একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যার মাধ্যমে ইরানের

অর্থনীতিতে বিপুল আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান আসবে। ইতিহাসের এই প্রথম মার্কিন

যুক্তরাষ্ট্র দাপ্তরিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে বাধ্য হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী ও লেবানন নিয়ে নতুন সমীকরণ: চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, লেবাননসহ

মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং কোনো পক্ষই আর

শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ওমানের সাথে যৌথভাবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী

ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি নতুন আইনি ও পরিচালন কাঠামো ঘোষণা

করবে ইরান। তবে মার্কিন ব্লক বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত প্রণালীর

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে।

ইসরায়েলি শিবিরে চরম উদ্বেগ, নেতানিয়াহুর ক্ষোভ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই আসন্ন

শান্তি চুক্তিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক

বিশ্লেষকদের মতে, তেল আবিব কোনোভাবেই এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ছিল না। প্রধানমন্ত্রী

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণের সামনে যে রণকৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ

করেছিলেন, তা ছিল ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলা।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার সাথেই চুক্তি করে ফেলায় ইসরাইলি

প্রশাসন ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত

নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে, কারণ লেবানন সীমান্ত

সুরক্ষিত না হলে উত্তর ইসরায়েলের বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ নাগরিক ঘরে ফিরতে পারবে না,

যা আগামী ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে। তাই চুক্তি

সইয়ের আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায়ের মরিয়া

চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরাইল। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos