পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। সময়ের হিসাব নিকাশে ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় পশুর হাটগুলোতে এখন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত। রাজধানীর গাবতলী, বসিলা, আফতাবনগরসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পশুবাহী
পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জমে উঠতে শুরু
করেছে কোরবানির পশুর হাট। সময়ের হিসাব নিকাশে ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায়
পশুর হাটগুলোতে এখন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত। রাজধানীর গাবতলী, বসিলা,
আফতাবনগরসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন
প্রান্ত থেকে শত শত পশুবাহী ট্রাক এসে পৌঁছাচ্ছে। তবে হাটগুলোতে পশুর পর্যাপ্ত
সরবরাহ থাকলেও দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে চলছে চিরাচরিত দরকষাকষি। এবারের
হাটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—উচ্চবিত্ত বা বিলাসী ক্রেতাদের বড় গরুর প্রতি
আগ্রহ থাকলেও, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ মাঝারি আকারের গরুর দিকে।
হাটের সার্বিক চিত্র ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া: রাজধানীর প্রধান পশুর হাট
গাবতলী ঘুরে দেখা যায়, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ এবং রাজশাহী থেকে
খামারিরা তাদের সেরা পশুগুলো নিয়ে এসেছেন। হাটের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে
সন্তুষ্টি থাকলেও বেচাকেনার গতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বিক্রেতারা।
কুষ্টিয়া থেকে আসা খামারি মো. রহমত আলী জানান, ‘হাটে মানুষ আসছে প্রচুর, তবে বেশির
ভাগই এখন দেখছেন আর দাম যাচাই করছেন। দুই-একদিন পর পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে বলে আশা
করছি।’
এদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম কিছুটা চড়া। বেসরকারি
চাকরিজীবী আহসান হাবীব হাটে এসেছেন কোরবানির গরু কিনতে। তিনি বলেন, ‘এবার বাজেটের
মধ্যে গরু মেলা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে যে
গরুগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর আকার বেশ ছোট। মাঝারি সাইজের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে
দেড় লাখ থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা।’
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং খামার
ব্যবস্থাপনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই এবার পশুর দাম কিছুটা বাড়তি। তবে বিক্রেতাদের
দাবি, হাটে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে, তাই শেষ মুহূর্তে দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই চলে
আসবে।
মাঝারি গরুর বাজারে উপচে পড়া ভিড়: এবারের কোরবানির হাটে সবচেয়ে বেশি চাহিদা লক্ষ্য
করা যাচ্ছে ৮০ থেকে ১৫০ কেজি মাংস হতে পারে—এমন মাঝারি আকারের গরুর। মধ্যবিত্ত
পরিবারের বাজেট এবং নগরের ফ্ল্যাট বাড়ির আবাসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই
আকারের গরুর চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ছে। হাট ইজারাদারদের সূত্রে জানা গেছে, হাটে বড় ও
রাজকীয় নামের গরুর দিকে মানুষের কৌতূহল ও ভিড় বেশি থাকলেও, প্রকৃত বিক্রি হচ্ছে
মাঝারি ও ছোট আকারের গরুগুলো। অনেক ক্রেতা আবার ঝক্কি ঝামেলা এড়াতে হাটের শুরুর
দিকেই পছন্দের মাঝারি গরু কিনে বাড়ি ফিরছেন।
সীমান্তে কড়াকড়ি: দেশি খামারিদের সুরক্ষায় জোর: বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি এবং
স্থানীয় খামারিদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল চোরাই পথে বিদেশি পশু আসা বন্ধ করা। দেশীয়
খামারিদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে এবার সীমান্তে কড়া নজরদারি আরোপ করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সীমান্ত এলাকায়
টহল জোরদার করেছে যাতে কোনোভাবেই অবৈধ পথে ভারতীয় গরু দেশের বাজারে প্রবেশ করতে না
পারে।
তবে কয়েকটি হাটে বিচ্ছিন্নভাবে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় খামারিরা উদ্বেগ
প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশেই এবার কোরবানির চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত
রয়েছে। ফলে বাইরের গরু বাজারে ঢুকলে দেশি খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন।
সরকার অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে, চোরাচালান রোধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি
গ্রহণ করা হয়েছে।
জাল টাকা ও হাটের অনিয়ম রোধে কঠোর প্রশাসন: কোরবানির হাটের অন্যতম বড় আতঙ্ক হলো জাল
টাকার চক্র এবং অজ্ঞানপার্টি বা মলমপার্টির খপ্পর। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে
আসা সরল-সোজা খামারিরা প্রায়শই এই চক্রগুলোর শিকার হন। এই অনিয়ম ও অপরাধ রোধে এবার
রাজধানীর প্রতিটি হাটে বিশেষ বুথ স্থাপন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
স্মার্ট ওয়াচ টাওয়ার ও সিসিটিভি: হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও
র্যাবের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে।
জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি হাটে বিনামূল্যে জাল
টাকা পরীক্ষা করার জন্য স্বয়ংক্রিয় মেশিনসহ বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতা
উভয়েই টাকা লেনদেনের সময় এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন।
হাসিল নিয়ে কড়াকড়ি: ইজারাদারদের নির্ধারিত হাসিলের অতিরিক্ত টাকা আদায় রুখতে হাটের
বিভিন্ন পয়েন্টে মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি
চালু রয়েছে।
ডিজিটাল হাটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: ঐতিহ্যবাহী শারীরিক হাটের পাশাপাশি এবারও বেশ সাড়া
ফেলছে ডিজিটাল বা অনলাইন পশুর হাট। যাতায়াতের ভোগান্তি, কাদা-পানি এবং হাটের কোলাহল
এড়াতে অনেক নগরবাসী অনলাইনেই ছবি ও ভিডিও দেখে লাইভ ওয়েটের (জীবন্ত ওজন) ভিত্তিতে
গরু কিনছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো শতভাগ
যাচাইকৃত এবং সুস্থ পশুর নিশ্চয়তা দিচ্ছে, যা কোরবানির বাজারকে আরও আধুনিক ও সহজ
করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, উৎসবের আমেজে প্রস্তুত রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলো। খামারিরা যেমন তাদের
বছরান্তের খাটাখাটুনির ন্যায্য মূল্য পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছেন, তেমনি ক্রেতারাও
চান তাদের সামর্থ্যের মধ্যে একটি সুস্থ ও সুন্দর পশু কোরবানি দিতে। আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর কঠোর নজরদারি, দেশি পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কৃত্রিম সংকট রোধে সরকারের
সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এবারের কোরবানির হাট ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই
স্বস্তিদায়ক হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।











