জাহাজ ভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের আধিপত্য, বাড়ছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব

জাহাজ ভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের আধিপত্য, বাড়ছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শীর্ষে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাতের প্রধান কাঁচামালের জোগানদাতা নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) এবং বিভিন্ন শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য

বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শীর্ষে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধু দেশের

ইস্পাত খাতের প্রধান কাঁচামালের জোগানদাতা নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন,

কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

পালন করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) এবং বিভিন্ন শিল্প

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড়

জাহাজ পুনর্ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।

বর্তমানে দেশের জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার শিল্প থেকে বছরে প্রায় ২.১ বিলিয়ন

মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পমহল

দাবি করছে। একই সঙ্গে এই শিল্প দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের জন্য প্রয়োজনীয়

ইস্পাতের একটি বড় অংশ সরবরাহ করছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা (রিসাইক্লিং)

শিল্পে ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তন, পরিবেশবান্ধব রূপান্তর এবং বৈশ্বিক বাজারের শেয়ারে

বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে শীর্ষ জাহাজ ভাঙা

দেশের অবস্থানটি হারায় এবং ভারত শীর্ষস্থানে চলে আসে। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম

(NSP) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মাত্র ৮৮টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে

(২.৬৮ মিলিয়ন টন), যা ২০২৪ সালের (১৩০টি জাহাজ) তুলনায় ৩২% কম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ

প্রায় ২.৭৪ মিলিয়ন গ্রস টন জাহাজ পুনর্ব্যবহার করেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪৩

শতাংশ। এ সময় বিশ্বের ভাঙা বাল্ক ক্যারিয়ারের ৬৭ শতাংশ, গ্যাসবাহী জাহাজের ৫৮ শতাংশ

এবং তেলবাহী ট্যাংকারের ৪২ শতাংশ বাংলাদেশে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী

জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী হলেও

পুনর্ব্যবহারকৃত জাহাজের পরিমাণের দিক থেকে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

সীতাকুণ্ডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্পাঞ্চল

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে শতাধিক জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ এখানে আনা হয়। এসব জাহাজ ভেঙে পাওয়া

ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পাইপ, কেবল ও অন্যান্য উপকরণ দেশের বিভিন্ন

শিল্পে পুনরায় ব্যবহার করা হয়।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইস্পাত শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশই

আসে জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত থেকে। ফলে নির্মাণ শিল্পের ব্যয় কমাতে এ খাত

গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদান

জাহাজ ভাঙা শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া পরিবহন,

অক্সিজেন সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, ইস্পাত রি-রোলিং মিলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে

আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

সরকারও এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়ে থাকে। আমদানি শুল্ক, কর ও বিভিন্ন ফি

বাবদ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

সবুজ জাহাজ পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ‘হংকং কনভেনশন’ কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ

পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যে

দেশের ১৭টি জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের স্বীকৃতি অর্জন

করেছে।

সরকার ধীরে ধীরে অননুমোদিত ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে

কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে

বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চ্যালেঞ্জও কম নয়

সাফল্যের পাশাপাশি এ শিল্পকে ঘিরে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ

দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা এখনও

বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে উন্নয়নের

তাগিদ দিয়ে আসছে।

এছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জাহাজের কম সরবরাহ এবং নতুন

নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার কারণে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে কিছুটা নিম্নগতি দেখা গেছে।

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

পূরণে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে বাংলাদেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প আগামী দশকে আরও

বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার পুরোনো জাহাজ আগামী

বছরগুলোতে অবসরে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের জাহাজ ভাঙা শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ

ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাতকেই

শক্তিশালী করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা

করছেন।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos