অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার পাশাপাশি বিশ্বেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা
স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা
কমার পাশাপাশি বিশ্বেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে
জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দাবি, এই
চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের
অবসান ঘটবে এবং পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা এগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এক
বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি জনগণের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা
স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়
এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী আবারও খুলে দেওয়া হবে। এর আগে সেখানে পাতা
মাইন অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রণালীটি স্বাভাবিক হলে ইরানকে ঘিরে
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে এবং তেল পরিবহন পুনরায় শুরু হবে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়।
ফলে এই পথ চালু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব শর্তে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ
নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো প্রধান বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
ইরানের একটি দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত
করেছে যে আগামী ১৯ জুন দুই পক্ষ এই খসড়া সমঝোতায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হওয়ার
পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে
দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাবে।
সামরিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেওয়া বড় পদক্ষেপ হিসেবে খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরান
অবিলম্বে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াতের জন্য কৌশলগত হরমুজ
প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের
বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরের ওপর গত কয়েক মাস ধরে জারি রাখা তাদের নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে
প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে খসড়াটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে একটি চূড়ান্ত
ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন
করে আর কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন একটি
নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ইরানের ওপর থাকা তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে
নেবে, যার ফলে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে জ্বালানি তেল বিক্রি করার এবং তার
উপার্জিত রাজস্ব সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ হয়ে
থাকা ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পদ ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। এই আটকে থাকা
অর্থ সরাসরি নগদ তহবিল স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা
এবং বিশেষ আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ইরানকে ফেরত দেওয়া হবে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে তেহরান এই খসড়া চুক্তিতে স্পষ্ট
প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ইরান কখনো কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা তা
অর্জনের চেষ্টাও করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা
তাদের পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে, যার অর্থ এই সময়ে নতুন করে কোনো
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা যাবে না এবং পরমাণু স্থাপনাগুলোর বর্তমান পরিধিও আর
সম্প্রসারণ করা যাবে না।
তেলের বাজারে স্বস্তি
সমঝোতার খবর প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। সোমবার
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৬৫ ডলার বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৩ দশমিক
৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম
৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ৭৫ ডলারে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে চাপ কমবে।
ফলে জ্বালানি মূল্য আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব
সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫
সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭
শতাংশ। তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া এবং হংকংয়ের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
মার্কিন বাজারেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসদাক
সূচকের ফিউচার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি
যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনায় মার্কিন ডলারও অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল
হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমে আসা
এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা তেলের দাম ও ডলার—দুটোকেই নিচের দিকে
নিয়ে গেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা কমেছে।











