টানা অতিবর্ষণে পার্বত্যাঞ্চলে বিপর্যস্ত জনজীবন

টানা অতিবর্ষণে পার্বত্যাঞ্চলে বিপর্যস্ত জনজীবন

টানা অতিবর্ষণে রাঙামাটিসহ পার্বত্যাঞ্চলে দুর্যোগ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছেন। ভারি বর্ষণের ফলে বান্দরবান জেলার লামায় পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় ১ শিশুসহ দুই পরিবারের ৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে পাহাড়ধসে আরও দুই শিশু এবং চট্টগ্রামে

টানা অতিবর্ষণে রাঙামাটিসহ পার্বত্যাঞ্চলে দুর্যোগ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নদীর পানি বৃদ্ধি

পাওয়ায় বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছেন। ভারি বর্ষণের ফলে বান্দরবান জেলার লামায়

পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় ১ শিশুসহ দুই পরিবারের ৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া

কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে পাহাড়ধসে আরও দুই শিশু এবং চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে এক

শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলে অনেক ঝুঁকিতে রয়েছে সাধারণ বাসিন্দারা।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৪টা

পর্যন্ত জেলার ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ২৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে মোট ৪ হাজার ২৬৫ জন অবস্থান করছেন। আশ্রয় নেওয়া সবাইকে

প্রতিদিন তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১০০টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে

কাপ্তাইয়ে ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, বিলাইছড়িতে

৩৭টি এবং নানিয়ারচরে ২টি স্থানে পাহাড়ধসের খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর

মধ্যে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও বিতরণ করা হয়েছে।

বিলাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, উপজেলায় ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে

৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া এক বহিরাগত ব্যবসায়ী বুধবার থেকে

নিখোঁজ রয়েছেন। নতুন করে অন্য কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে, রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের দলমনি চাকমা (পিতা: অলা চাকমা) গত ৭

জুলাই নদী পারাপারের সময় স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার মরদেহ

উদ্ধার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা-দিঘীনালা সড়কের ৩ কিলোমিটার এলাকায় রাস্তা ধসে যাওয়ায়

যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। জেলা প্রশাসন,

স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা সার্বক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আশ্রয়কেন্দ্রে

থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

লামায় পাহাড়ধসে ঘুমন্ত শিশুসহ নিহত ৫: টানা চার দিনের ভারি বর্ষণের ফলে বান্দরবান

জেলার লামা উপজেলায় পাহাড় ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় ১ শিশুসহ দুই পরিবারের ৫ জন নিহত

হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি মিশন

পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মো. ইউনুছ (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২) ও চার

বছরের ছেলে মো. সোলেমান, মো. জুয়েল ( ২৭) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)।

অপরদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের এক

হাজার ঘরবাড়ি প্লাবিত ও পাহাড়ধসে পড়ে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। এছাড়া

লামা-আলীকদম সড়কের কেয়ারারঝিরি, রেপারপাড়া আবাসিক ও লাইনঝিরি এলাকা ঢলের পানিতে

ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে বিভিন্ন ইউনিয়নে চলতি মৌসুমের বীজতলা এবং

বিভিন্ন ফসলাদি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সড়করে উপর পাহাড়ধসে পড়ে, সড়কধসে ও ঢলের

পানিতে প্লাবিত হয়ে অভ্যন্তরীণসহ লামা-আলীকদম সড়ক যোগযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানায়, উজান থেকে নেমে আসা সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পানি পৌর

এলাকাসহ উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের নিচু এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে ওইসব এলাকার ঘরবাড়ি, দোকান

পাঠ, সরকারি বেসরকারি কার্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়। মাতামুহুরী নদী,

লামা খাল, বমু খাল, ইয়াংছা খাল, বগাইছড়ি খাল, ও পোপা খালসহ বিভিন্ন স্থানের পাহাড়ি

ঝিরিগুলোতে অস্বাভাবিক ভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে বিভিন্ন

পেশাজীবীর প্রায় ১২ হাজার মানুষ। কর্মহীন হয়ে বেকায়দায় পড়েছে ওইসব এলাকার শ্রমজীবী

মানুষ। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে শহরের দোকান ও ঘরবাড়ির মালামালসহ গৃহ পালিত পশু

নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বন্যা আক্রান্তরা। এদিকে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে

প্রাণহানির আশঙ্কায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদেরকে নিরাপদে আশ্রয় নিতে বিভিন্ন

মাধ্যমে মাইকিং শুরু করে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো। এর পাশাপাশি

বেসরকারি সংস্থা আশিকার উদ্যোগেও দুর্যোগ আগাম বার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি

কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দুযো©গ কবলিতরা আশ্রয় নিতে ৫৫ বিদ্যালয়কে অস্থায়ী

আশ্রয়ন কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয় প্রশাসন। এতে কয়েকশ পরিবার আশ্রয়ন নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর নাগাদ মাতামহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে

প্রবাহিত হয়। টানা ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ বন্যাসহ পাহাড়ধসে আরো মানবিক

বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন আজিনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন।

তিনি বলেন, অব্যাহত ভারি বর্ষণের ফলে আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় বৃহস্পতিবার (৯

জুলাই) ভোর চারটার দিকে পৃথকভাবে আচমকা পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ ও জুয়েল এর বসত ঘরের

উপর পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা স্থানীয়দের

সহায়তায় আক্রান্তদের উদ্ধার করেন। ততক্ষণে দুই পরিবারের ঘুমন্ত ৫ সদস্য মারা যান।

এদিকে একই রাত দেড়টার দিকে ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায় আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত

মহিলা সদস্য রেহানা বেগমের ঘরে পাহাড়ধসে পড়ে। এতে তিনি গুরুত্বর আহত হন। ফাইতং

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক জানান, তার ইউনিয়নে ৫০টির মত ঘরবাড়ি পাহাড়ধসে

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম

জানায়, পাহাড় ধসে ৫০টি ও ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে ১০০ ঘরবাড়ি। পানি বন্দি হয়েছে

১০০০ পরিবার। ফাসিয়াখালী ইউনিয়নে ব্যাপক হারে পাহাড় ধসে ঘরবাড়ি ও রাস্তা ঘাটের

ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে জানান ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জিয়াবুল হক। এছাড়া গজালিয়া, সরই,

রুপসীপাড়া ইউনিয়নেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে।

পাহাড়ধসে পাঁচজন নিহত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে লামা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত

কর্মকতা© মো. কাইছার হামিদ বলেন, পাহাড়ধসে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে

হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক।

এ বিষয়ে লামা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন বলেন, টানা

বর্ষণের শুরুতেই ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ পৌরবাসিদেরকে যথাসময়ে নিরাপদে

সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। শুধু তায় নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়েও তাগাদা দেওয়া হয়।

এরপরেও পাহাড়ধসে আজিজনগরের মিশন পাড়ায় শিশুসহ ৫জন নিহত ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে এক

হাজারের মত দোকানপাট-ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্রসহ

বন্যা কবলিতদের মাঝে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল না

থাকায় ও রাস্তা ঘাট ভেঙেচুরে তছনছ হওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পর্যন্ত

চুড়ান্তভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরুপন করা সম্ভব হয়নি।

চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই জনের মৃত্যু :

কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে পাহাড়ধসে ঘুমন্ত দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার

(৯ জুলাই) ভোররাতে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে।

নিহত এক কিশোরীর নাম রুমি আক্তার (১৫)। সে মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের

কন্যা এবং বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অপর শিশুর নাম মোহাম্মদ

তৌসিফ (১০)। সে একই এলাকার আবদুল মজিদের পুত্র এবং চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা

সর্ম্পকে একে অপরের চাচাতো জেঠাতো ভাইবোন।

বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে বেশ

কয়েকটি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে । আমার এলাকায় একটি কিশোর ও একটি শিশুর পাহাড়ধসে

মৃত্যু হয়েছে। খুবই মর্মান্তিক ঘটনা।

চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু: চট্টগ্রামের আনোয়ারায় জমে থাকা বৃষ্টির

পানিতে ডুবে মো. ইশতিয়াক নামে ছয় বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯

জুলাই) দুপুরে উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়নের নলদিয়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসান

সর্দ্দারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ইশতিয়াক ওই এলাকার মোহাম্মদ ইদ্রিসের ছেলে।

নিহতের চাচা আনোয়ার হোসেন বলেন, ইশতিয়াক সকালে খেলতে বের হয়েছিল, দুপুরের দিকে ঘরে

না ফেরায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেন স্বজনেরা। একপর্যায়ে বাড়ির পাশে জমে থাকা বৃষ্টির

পানির মধ্যে দেখতে পান তাকে। সেখান থেকে উদ্ধার করে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য

কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. অনিন্দিতা বলেন,

শিশুটিকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ

পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos