কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধানের বাজারে ক্রেতা সংকট এবং সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহের কঠিন শর্তের কারণে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া ধান কোনোমতে ঘরে তুললেও তা বিক্রি করতে না পেরে এক নিদারুণ অর্থকষ্টে দিন কাটছে এই অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিদের। ফলে বাধ্য হয়ে ন্যায্যমূল্য বিসর্জন দিয়ে তারা স্থানীয় দালালদের কাছে অত্যন্ত সস্তায় ধান বিক্রি করে
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধানের বাজারে ক্রেতা সংকট এবং সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহের
কঠিন শর্তের কারণে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া ধান
কোনোমতে ঘরে তুললেও তা বিক্রি করতে না পেরে এক নিদারুণ অর্থকষ্টে দিন কাটছে এই
অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিদের। ফলে বাধ্য হয়ে ন্যায্যমূল্য বিসর্জন দিয়ে তারা স্থানীয়
দালালদের কাছে অত্যন্ত সস্তায় ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা
গেছে।
কৃষকদের সহায়তায় সরকার ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করলেও এর সুফল সাধারণ চাষিদের
দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা পরীক্ষা ও ব্যাংক
হিসাবসহ নানাবিধ দাপ্তরিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে গুদাম
থেকে ধান ফেরত আনার বাড়তি পরিবহন খরচ জোগাতে না পেরে কৃষকেরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এই
সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণে ধান কিনে নিচ্ছে এবং
পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সেই ধানই সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ
উঠেছে।
ইটনা উপজেলা সদরের কৃষক সুলতান মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে
নানা ঝামেলায় পড়তে হয়। ভালো ধান নিয়ে গেলেও বলা হয়, ধান ময়লা বা আর্দ্রতা বেশি। তাই
বাধ্য হয়ে দালালের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।” সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য ১
হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও সাধারণ কৃষকের পকেটে তার সুফল যাচ্ছে না। কৃষক মহসিন
মিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “শ্রমিকের খরচ কাটা হয়, প্রতি মণে এক-দুই কেজি বেশি ধান
নেওয়া হয়, দালালকেও দিতে হয়।” তাঁর মতে, সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ
করলে এই শোষণ বন্ধ হতো।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ঋণের চাপের দ্বিমুখী সংকটে হাওরের জীবনযাত্রা এখন বিপর্যস্ত।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে আর্দ্রতা বেশি থাকায়
সরকারি গুদাম তা গ্রহণ করছে না। ইটনা উপজেলার লাইমপাশা গ্রামের কৃষক তারু মিয়া
বলেন, “একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে ঋণের চাপ-এই দুই সংকটে আমরা আরও বিপাকে
পড়েছি।” ক্ষুদ্র কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে ধান দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ও বড়
কৃষকেরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। ছিলনী গ্রামের কৃষক এমাদ মিয়া এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ
করে বলেন, “আমাদের মতো ছোট কৃষকেরা সুযোগই পাই না।”
প্রশাসনিক ও কৃষি কর্মকর্তারা এই সংকটের কথা স্বীকার করলেও সরকারি নীতিমালার বাইরে
পদক্ষেপ নিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম
জানান, “বেশি আর্দ্রতার ধান কেনা সম্ভব নয়। এতে সংরক্ষণে ঝুঁকি থাকে। সরকারি
নির্দেশনার বাইরে আমাদের কিছু করার নেই।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার
হাওলাদার মনে করেন, ধান শুকাতে না পারাটাই বর্তমান পরিস্থিতির মূল অন্তরায়। ইটনা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর আশ্বাস দিয়ে বলেন, “গুদামে
হয়রানির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় এবার প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল
তলিয়ে গেছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অর্ধলাখ কৃষক। চাষিদের দাবি অনুযায়ী ক্ষতির
আর্থিক মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। জেলায় ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের বিপরীতে
সরকারি ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, যা চাহিদার তুলনায়
নগণ্য। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, লটারির
মাধ্যমে তালিকা করায় অনেক কৃষক বাদ পড়ছেন, যা অসন্তোষের কারণ হতে পারে। জেলা
প্রশাসক সোহানা নাসরিন এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, “সরকার চায় কৃষকেরা যেন
কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন। কৃষকদের হয়রানির অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”











