লোভনীয় চাকরির টোপ, কম্বোডিয়ায় ‘মানুষ বিক্রির’ হাটে বন্দি বাংলাদেশিরাও

লোভনীয় চাকরির টোপ, কম্বোডিয়ায় ‘মানুষ বিক্রির’ হাটে বন্দি বাংলাদেশিরাও

যে তরুণের চোখে ছিল পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচানোর স্বপ্ন, যার হাতে থাকার কথা ছিল একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশার ল্যাপটপ কিংবা মাউস; আজ তার শরীরে শোভা পাচ্ছে বৈদ্যুতিক শকের কালচে দাগ। কম্বোডিয়ার গহীন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা সিহানুকভিলের কড়া পাহারায় থাকা বহুতল ভবনগুলো এখন পরিণত হয়েছে আধুনিক যুগের দাসত্বখানায়। সেখানে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ কিংবা ‘ডেটা এন্ট্রি কর্মীর’ লোভনীয়

যে তরুণের চোখে ছিল পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচানোর স্বপ্ন, যার হাতে থাকার কথা ছিল

একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশার ল্যাপটপ কিংবা মাউস; আজ তার শরীরে শোভা পাচ্ছে বৈদ্যুতিক

শকের কালচে দাগ। কম্বোডিয়ার গহীন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা সিহানুকভিলের

কড়া পাহারায় থাকা বহুতল ভবনগুলো এখন পরিণত হয়েছে আধুনিক যুগের দাসত্বখানায়।

সেখানে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ কিংবা ‘ডেটা এন্ট্রি কর্মীর’ লোভনীয় চাকরির আড়ালে

বন্দি রয়েছেন শত শত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী। এটি কেবল সাধারণ কোনো মানবপাচার নয়;

বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর ‘সাইবার দাসত্ব’ যেখানে নিজের দেশের মানুষকে জিম্মি

করে বাধ্য করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্তরের ডিজিটাল জালিয়াতি বা স্ক্যামিং করতে।

সম্প্রতি কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরেছেন বেশ

কয়েকজন বাংলাদেশি। তাদের চোখে-মুখে এখনো লেপ্টে আছে মৃত্যুর আতঙ্ক। তাদের দেওয়া

লোমহর্ষক জবানবন্দি এবং পুলিশ ও অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞদের তথ্য বিশ্লেষণ করে

বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চক্রের হাড়ির খবর।

স্বপ্নের আড়ালে পাতা মরণফাঁদ: এই চক্রের শিকার সিংহভাগই দেশের শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত

বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার তরুণ। সিরাজগঞ্জের ২৬ বছর বয়সি তোফায়েল

আহমেদের গল্পটি দিয়েই শুরু করা যাক। স্নাতক শেষ করে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি ও

পাশাপাশি ইন্স্যুরেন্সের কাজ করেও যখন পরিবারের হাল ধরতে পারছিলেন না, তখন তিনি

বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের অতি ঘনিষ্ঠ, রক্ত সম্পর্কের এক বন্ধু—যিনি

নিজে চীন থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসেছেন—তাকে কম্বোডিয়ায় দ্রুত ও ভালো বেতনের

চাকরির লোভ দেখায়।

দালাল চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ হয় ঢাকার এক চায়ের দোকানে। কম্পিউটার অপারেটর পদের

প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাবি করা হয় ৭ লাখ টাকা। তোফায়েল ফকিরাপুলের একটি এজেন্সির

মাধ্যমে এই টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু হাতে যে ভিসা আসে, তা ছিল মূলত ‘কনস্ট্রাকশন

ওয়ার্কার’ বা নির্মাণ শ্রমিকের। দালালরা সান্ত্বনা দেয়, ‘সেখানে গেলে সব ঠিক হয়ে

যাবে।’

২০২৫ সালের ৩০ জুন ঢাকা থেকে রওনা হন তোফায়েল। ব্যাংককে ট্রানজিট নেওয়ার সময়

ট্রানজিট ভিসার জটিলতা দেখা দিলে দালালের চক্র বিমানবন্দরের ভেতরেই বিশেষ প্রভাব

খাটিয়ে তাকে বোর্ডিং পাস করিয়ে দেয়। বিমানে ওঠার ঠিক আগে দালালের এক লোক তার

হাতে ধরিয়ে দেয় নগদ ২ হাজার ডলার। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি হয়তো কোনো

দয়ালু এজেন্সির কাজ; কিন্তু মূলত এটিই ছিল তাকে কিনে নেওয়ার প্রথম কিস্তি।

রিসিভ থেকে বন্দিশালা: কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন বিমানবন্দরে নামার পর প্রথম দুই

দিন বাংলাদেশিদের রাখা হয় বেশ ভালো মানের হোটেলে। চমৎকার খাওয়া-দাওয়া আর ভালো

ব্যবহার দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে সামনে কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে।

তৃতীয় দিন ইন্টারভিউ বা কাজের কথা বলে যখন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই

গন্তব্য হয় শহর থেকে প্রায় ১২০ থেকে দেড়শ কিলোমিটার দূরের কোনো নির্জন পাহাড়ি

এলাকা কিংবা থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছাকাছি কোনো কড়া পাহারাবেষ্টিত

ভবন। তোফায়েল ও মানিকগঞ্জের তালাত মাহমুদের মতো ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা হুবহু এক।

স্ক্যাম সেন্টারের প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো মাত্রই ছবি তুলে ভেতরে পাঠানো হয়। সবুজ

সংকেত মিললেই বিশাল গেট পার করে তাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ভেতরে ঢোকা

মাত্রই কেড়ে নেওয়া হয় তাদের মূল পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন এবং বিমানবন্দর থেকে

দেওয়া সেই ২ হাজার ডলার।

সেখানেই প্রথম প্রকাশ পায় নির্মম সত্য: তোমাকে এখানে কোনো চাকরির জন্য আনা হয়নি।

তোমাকে ৩ হাজার বা ২ হাজার ডলারের বিনিময়ে আমরা কিনে নিয়েছি। এখন আমরা যা বলব,

তোমাকে তাই করতে হবে।

আধুনিক সাইবার দাসত্বের ভেতরের গল্প: ‘লাভ স্ক্যাম’ ও ডিজিটাল প্রতারণা

স্ক্যাম সেন্টারের বহুতল ভবনগুলো একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দুর্গের মতো। চারদিকে

কাঁটাতার, সশস্ত্র প্রহরী এবং সিসিটিভি ক্যামেরা। ভবনের এক তলায় হয়তো স্পা,

সুপারমার্কেট বা খাবারের দোকান রয়েছে; কিন্তু কর্মীদের বাইরে যাওয়ার কোনো অধিকার

নেই। জানালাগুলো লোহার গ্রিল দিয়ে শক্তভাবে আটকানো।

সেখানে বাধ্য করা হয় মূলত ‘লাভ স্ক্যাম’ বা রোমান্টিক প্রতারণার কাজে যুক্ত হতে।

ফরিদপুরের আল আমিনের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় এই প্রতারণার ভেতরের সুসংগঠিত রূপ।

পরিচয় চুরি ও প্রোফাইল তৈরি: প্রতিটি কর্মীকে সুন্দরী মেয়েদের নাম ও ভুয়া ছবি

ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলতে দেওয়া

হয়।

টার্গেট নির্ধারণ: মূলত আমেরিকা, ইউরোপ বা উন্নত দেশের বয়স্ক ও একাকী অবসরপ্রাপ্ত

মানুষদের টার্গেট করা হয়।

সম্পর্ক স্থাপন: দিনের পর দিন চ্যাটিং করে তাদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা

হয়। আস্থা অর্জনের জন্য মাঝেমধ্যে কিছু নারীকে দিয়ে ভিডিও কলও দেওয়ানো হয়।

বিনিয়োগের ফাঁদ ও হ্যাকিং: সম্পর্ক যখন গভীর হয়, তখন তাদের কোনো ভুয়া

ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ইনভেস্টমেন্ট স্কিমে টাকা লাগাতে প্রলুব্ধ করা হয়। সবশেষে

হ্যাকারদের সহায়তায় ভুক্তভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়া হয়।

এখানে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি পাকিস্তানি, নেপালি, দক্ষিণ ভারতীয়, তামিল ও ভুটানি

যুবকদেরও দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা টানা কাজ করতে

বাধ্য করা হয় তাদের।

টার্গেট পূরণে ব্যর্থতা ও মধ্যযুগীয় বর্বরতা: স্ক্যাম সেন্টারে প্রতিদিনের কাজের

জন্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ‘টার্গেট’ দেওয়া থাকে। এই টার্গেট পূরণ করতে না

পারলে কিংবা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন।

তোফায়েল ও তালাত জানান, তাদের একটি নির্জন অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে

হাত-পা বেঁধে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো, হকিস্টিক দিয়ে অনবরত পেটানো হতো। দিনের পর

দিন কেবল শুকনো নুডলস খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে তাদের, মাঝেমধ্যে তাও মিলত না।

এমনকি পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হতো। তালাত এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে

নিজের মুখে কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। নারীদের অবস্থাও এর চেয়ে ভিন্ন

নয়। মাইমুনা আক্তার মিলির মতো অনেক নারীও উচ্চ বেতনের লোভে গিয়ে সেখানে বছরের পর

বছর বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।

মুক্তি ও দেশে ফেরার চড়া মূল্য: এই নরককুণ্ড থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো মোটা

অঙ্কের মুক্তিপণ। তোফায়েল নিজের বুদ্ধিমত্তায় ও যেকোনো উপায়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা

আনিয়ে সেই স্ক্যাম সেন্টার থেকে মুক্তি পান। কিন্তু মুক্তি পেলেও মেলেনি পাসপোর্ট

বা বৈধ ভিসা।

কম্বোডিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে প্রতিদিন ১০ ডলার করে জরিমানা দিতে হয়।

আড়াই মাসের বেশি অবৈধভাবে থাকায় বিশাল জরিমানা জমে তোফায়েলের। পরবর্তীতে

বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ সহযোগিতায় জরিমানা মওকুফ করিয়ে এবং দেশ থেকে আরও ৮২

হাজার টাকা দিয়ে বিমানের টিকিট কেটে চলতি বছরের ১৪ জুন তিনি দেশে ফেরেন।

একইভাবে ১ জুলাই সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় ১০ জন নারীসহ ১০৯ জন বাংলাদেশি

কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, সম্প্রতি সর্বমোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি

কম্বোডিয়া থেকে ফেরত এসেছেন। তবে ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড

ট্রেনিংয়ের তথ্যানুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের

উদ্দেশে কম্বোডিয়ায় গেছেন। এই বিশাল সংখ্যার কতজন এখন স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি,

তার সঠিক পরিসংখ্যান মেলা ভার।

প্রশাসনের ভূমিকা এবং আইনি সীমাবদ্ধতা: কম্বোডিয়া থেকে শত শত তরুণ সর্বস্ব হারিয়ে

ফিরলেও সেই অনুপাতে মামলার সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।

সিআইডির মানবপাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মানুষ

নিঃস্ব হয়ে ফিরলেও আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে দ্বিধাবোধ করেন। অনেকেই ভাবেন মামলা

করলে হয়রানি বাড়বে, তার চেয়ে দালালের পা ধরে যদি কিছু টাকা উদ্ধার করা যায়।

পাচারকারী চক্রও প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার কম্বোডিয়া,

লাউস ও ভিয়েতনামে যাতায়াতে কড়াকড়ি আরোপ করার পর পাচারকারীরা এখন জাল BMET কার্ড

ব্যবহার করছে অথবা কর্মীদের ট্যুরিস্ট হিসেবে প্রথমে থাইল্যান্ডে পাঠাচ্ছে এবং

সেখান থেকে সড়কপথে কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে চালান করে দিচ্ছে।

সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দাবি: কম্বোডিয়ার এই ‘সাইবার দাসত্ব’ কেবল একটি

অভিবাসন সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের এক সংঘবদ্ধ নীলনকশা। প্রবাসী

কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওসে

যাওয়ার ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর করেছে।

তবে কেবল নীতিমালাই যথেষ্ট নয়। দালালরা যখন খোদ বিমানবন্দরে নির্দিষ্ট পিলারের

পাশে দাঁড় করিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় বোর্ডিং পাস পাইয়ে দেয়, তখন ভেতরের নিরাপত্তা

ব্যবস্থার গলদগুলোকেও চিহ্নিত করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারি স্মার্ট

কার্ড বা BMET ক্লিয়ারেন্স থাকলেই চাকরিটি বৈধ—এমন অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে

হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তথাকথিত ‘আইটি সেক্টর’ বা

‘কম্পিউটার অপারেটর’ পদের লোভনীয় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষকে শতভাগ সচেতন

হতে হবে। তা না হলে, জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়া তরুণদের জীবনের গল্পগুলো এভাবেই

ট্র্যাজেডি হয়েই থেকে যাবে।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos