হাওরে একের পর এক ডাকাতি, জনমনে আতঙ্ক

হাওরে একের পর এক ডাকাতি, জনমনে আতঙ্ক

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন নৌপথে কয়েক দিনের ব্যবধানে লাশবাহী নৌকা, গরু ব্যবসায়ী, হাঁস ব্যবসায়ী ও পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন নৌপথে টহল জোরদার করেছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ

মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের

বিভিন্ন নৌপথে কয়েক দিনের ব্যবধানে লাশবাহী নৌকা, গরু ব্যবসায়ী, হাঁস ব্যবসায়ী ও

পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন নৌপথে টহল জোরদার

করেছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা

পুলিশ। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন জনপ্রতিনিধিরা।

কয়েকদিনের ব্যবধানে একের পর এক ডাকাতি।

গত ৭ জুলাই রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া হাওরের নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় ১৫

দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী নৌকায় হামলা চালায় মুখোশধারী ডাকাতরা। অস্ত্রের মুখে

জিম্মি করে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, সোলার ব্যাটারি ও নগদ টাকা লুট করে

নেয়। মানবিক এই ঘটনাটি জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এর পরদিন, সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের হাওরে

তিন গরু ব্যবসায়ীর নৌকায় ডাকাতি হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, ডাকাতরা মারধর করে তাদের

কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা লুট করে।

একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর

সেতুসংলগ্ন বগাডুবি খাল এলাকায় হাঁস ব্যবসায়ীদের বহনকারী আরেকটি নৌকায় ডাকাতি হয়।

নগদ ৭৫ হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন, হাঁড়ি-পাতিল ও ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম লুট

করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।

এর আগে গত ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পর্যটকবাহী

একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রায় ৪০ জন পর্যটকের কাছ থেকে

নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়।

আতঙ্কে হাওরবাসী

ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল মিয়া বলেন, প্রায় প্রতিদিনই গ্রামের

পাশের চরের বিলে ডাকাতদের ঘোরাফেরা দেখা যায়। গ্রামবাসী পালাক্রমে পাহারা দেওয়ায়

তারা বাড়িতে উঠতে পারে না। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে ডাকাত ঘুরাঘুরি করতেছে,

অথচ ভয়ে কিছুই করতে পারতেছি না।’ বর্তমানে গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাহারাদার নিয়োগ

করা হয়েছে।

মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু বলেন,

আগে রাতে চলাচলে ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, সেই

দুশ্চিন্তা কাজ করে। তার ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের সামনের মতো ব্যস্ত জায়গায় দিনের

আলোতে ডাকাতির ঘটনা কল্পনাও করা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন গ্রামের কিছু

মানুষ ডাকাতদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে।

করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া গ্রামের নৌকার মাঝি হাবিকুল ইসলাম বলেন, আগে দেশের

বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা হাওরে এসে রাত কাটাতেন। এখন সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরে

যান। তিনি বলেন, ‘এখন তো অন্ধকারও লাগে না, দিনের আলোতেই ডাকাতেরা হামলা দেয়।’

প্রশাসনের পদক্ষেপ

ডাকাতি বৃদ্ধির পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় ডাকাতিপ্রবণ

জলপথে বিশেষ নৌ-টহল শুরু করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বিকেল সাড়ে

৫টার পর প্রয়োজন ছাড়া হাওরাঞ্চলে নৌপথে চলাচল না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার বলেন, এক মাস আগে সংঘটিত একটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার

করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দুটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান

চলছে। ডাকাতি প্রতিরোধে করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ এবং

ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায়

আনা হবে।

প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ

গত ১২ জুলাই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও

কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম বলেন, হাওরের ডাকাতি দমনে আইনশৃঙ্খলা

বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। তার ভাষ্য, প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকা রয়েছে।

পুরনো রেকর্ডের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালালে ডাকাতরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট

ফজলুর রহমান নৌযান চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত এটি।’ তার

মতে, হাওরবাসীর প্রয়োজনেই গভীর রাত পর্যন্ত নৌযান চলাচল করতে হয়। তাই এ সিদ্ধান্ত

পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

তিনি জানান, এলাকায় গিয়ে জনগণকে সংগঠিত করে ডাকাতদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা

হবে। পাশাপাশি ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম থানার জন্য তিনটি দ্রুতগামী স্পিডবোট

বরাদ্দেরও দাবি জানান তিনি। তার ভাষ্য, ডাকাতরা দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে। তাই

তাদের মোকাবিলায় পুলিশের কাছেও আধুনিক জলযান থাকা প্রয়োজন।

লাশবাহী নৌকায়ও ডাকাতি

৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে করিমগঞ্জ

উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় ডাকাতির শিকার হন মিঠামইন

উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের চমকপুর গ্রামের আবদুল হক।

তিনি জানান, তার ভাতিজা বাবু মিয়ার ১৫ দিন বয়সী কন্যাশিশু জন্মের পর অসুস্থ হয়ে

পড়লে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি

করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জুলাই বিকেলে শিশুটি মারা যায়। পরে পরিবারের

সদস্যরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

আবদুল হকের ভাষ্য, করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার প্রায় ১৫ মিনিট পর একটি

ছোট নৌকায় করে ছয় সদস্যের মুখোশধারী ডাকাতদল তাদের গতিরোধ করে। নৌকায় একটি শিশুর

মরদেহ রয়েছে এ কথা জানিয়ে অনেক অনুরোধ করা হলেও ডাকাতরা কোনো কর্ণপাত করেনি।

মারধরের ভয় দেখিয়ে তারা তিনটি মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।

একই নৌকায় থাকা দুলেনা বেগম বলেন, ‘বড় বড় নৌকা, লঞ্চ কিংবা গাড়িতে ডাকাতির কথা

শুনেছি। কিন্তু লাশবাহী নৌকাতেও যে ডাকাতি হতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। এবার

নিজের চোখেই দেখলাম।’

নৌকার মাঝি রতন মিয়া জানান, নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় পৌঁছানোর পর ডাকাতরা নৌকায়

উঠে সোলার প্যানেলের ব্যাটারি এবং প্রায় চার হাজার টাকা লুট করে নেয়। তার ভাষায়,

‘ডাকাতরা সবাই মুখোশ পরা ছিল। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই মারতে উদ্যত হচ্ছিল।

একপর্যায়ে প্রাণভয়ে বলেছি, যা আছে সব নিয়ে যান, কিন্তু কাউকে মারবেন না।’

মিঠামইনে গরু ব্যবসায়ীদের নৌকায় ডাকাতি, লুট সাড়ে ৫ লাখ টাকা।

লাশবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনার মাত্র একদিন পর ৮ জুলাই সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে

মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের হাওরে ডাকাতির শিকার হন তিন গরু

ব্যবসায়ী।

ভুক্তভোগী নাজিম উদ্দীন জানান, নিকলী সাজনপুর বাজারে চারটি গরু বিক্রি করে অন্য

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে ছয় সদস্যের

একটি ডাকাত দল নৌকার গতিরোধ করে।

তিনি বলেন, ডাকাতরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে প্রাণের

ভয়ে তিনি ও সঙ্গে থাকা অন্য দুই ব্যবসায়ী প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা ডাকাতদের হাতে তুলে

দিতে বাধ্য হন।

নাজিম উদ্দীনের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্রামের কিছু লোক আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের চলাচল ও

টাকার তথ্য সংগ্রহ করে ডাকাতদের কাছে পৌঁছে দেয়।

ইটনায় একই সন্ধ্যায় আরও এক ডাকাতি

একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর

সেতুসংলগ্ন বগাডুবি খালে আরেকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

ডাকাতির শিকার সদরঞ্জন দাস জানান, তিনি ও তার এক সহযোগী সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা

থেকে হাঁসের বাচ্চা কিনতে তাড়াইলের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। পথে সাত সদস্যের একটি

সশস্ত্র ডাকাত দল নৌকার গতিরোধ করে।

তিনি বলেন, ডাকাতরা হাঁড়ি-পাতিল, ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দুটি মোবাইল ফোন এবং

নগদ ৭৫ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

নদীতে পাহারার দায়িত্বে থাকা ফুল মিয়া বলেন, চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই

ব্যক্তিকে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাদের নিরাপদে বর্শিকুড়া বাজারে নিয়ে

আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রুমেল মিয়া জানান, খবর পেয়ে কয়েকটি নৌকা নিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করা

হলেও তারা এলংজুরী ইউনিয়নের দিকে পালিয়ে যায়।

পর্যটকবাহী ট্রলারেও হামলা

এর আগে ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পর্যটকবাহী

একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী রাজিব আহমেদ জানান, প্রায় ৪০ জন পর্যটক হাওর ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে দেশীয়

অস্ত্রে সজ্জিত ডাকাতদল ট্রলারে উঠে সবাইকে জিম্মি করে।

তিনি বলেন, ডাকাতরা নারী যাত্রীদেরও মারধর ও হেনস্তা করে। পরে মোবাইল ফোন, নগদ

অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তার দাবি, প্রায় ৪০ লাখ

টাকার মালামাল লুট হয়েছে।

মসজিদের মাইকে ডাকাতের ঘোষণা, এবার মুয়াজ্জিনকে হুমকি

ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে মসজিদের মাইকে ডাকাতের উপস্থিতির ঘোষণা দেওয়ায় স্থানীয়

মুয়াজ্জিন আবদুল মতিনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ছিলনী জামে মসজিদে দায়িত্ব পালন করা আবদুল মতিন

গ্রামবাসীর অনুরোধে ডাকাতের উপস্থিতির ঘোষণা দেন। পরে স্থানীয় লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে

এগিয়ে গেলে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। তবে পরে স্থানীয় জেলে ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে

ডাকাতরা হুমকি দিয়ে যায়। তারা বলে, ‘এই মসজিদের মুয়াজ্জিনকে যেখানে পাব, তার খবর

আছে।’

আবদুল মতিন বলেন, ‘আমি এই গ্রামেরই মানুষ। মানুষের প্রয়োজনে মসজিদের মাইকে ঘোষণা

দিই। এখন যদি সেই দায়িত্ব পালন করায় ডাকাতদের হুমকি শুনতে হয়, তাহলে আমরা কোথায়

যাব?’

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos