দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় চলতি মৌসুমে গত ২ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে নানা জাতের সুস্বাদু আম। গুটি, নাগ ফজলি, হিমসাগর, আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগোসহ বিভিন্ন জাতের আমে সরগরম হয়ে উঠেছে বাজার। ক্রেতারাও নিজেদের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী আম কিনছেন। তবে মৌসুমের শুরুতে বাজারে
দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় চলতি মৌসুমে গত ২ মে থেকে
আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠতে শুরু
করেছে নানা জাতের সুস্বাদু আম। গুটি, নাগ ফজলি, হিমসাগর, আম্রপালি, ব্যানানা
ম্যাংগোসহ বিভিন্ন জাতের আমে সরগরম হয়ে উঠেছে বাজার। ক্রেতারাও নিজেদের পছন্দ ও
সামর্থ্য অনুযায়ী আম কিনছেন। তবে মৌসুমের শুরুতে বাজারে কিছুটা মন্দাভাব বিরাজ করায়
আশানুরূপ দাম না পেয়ে হতাশ অনেক চাষি।
নওগাঁর বিস্তীর্ণ আমবাগান ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারও কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের
মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারে দামের অস্থিরতা
নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রপ্তানির পরিধি বাড়ানো এবং আম
প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে দেশের এই বৃহৎ আম উৎপাদন অঞ্চলের কৃষকরা আরও
ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং আম অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে।
আম ব্যবসায়ী ও চাষিদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে
পাইকারি ব্যবসায়ীরা নওগাঁর মোকামগুলোতে আসতে শুরু করলে বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং
আমের দামও বৃদ্ধি পাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে নওগাঁ জেলায় আমের আবাদ ছিল
মাত্র ৬ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে। এক দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে। চলতি
মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এসব বাগান থেকে প্রায় ৪
লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের লক্ষ্যে জেলার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আম্রপালি,
ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি জাতের প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ৫১ হাজার ৫০০টি আমে ফ্রুট
ব্যাগিং করা হয়েছে। গত বছর জেলার সাপাহার ও পোরশা উপজেলা থেকে বিভিন্ন
রপ্তানিকারকের মাধ্যমে ২৮৪ টন আম্রপালি, খিরসাপাত ও ব্যানানা ম্যাংগো মধ্যপ্রাচ্য ও
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছিল।
চাষিদের হিসাবে, এক বিঘা মাঝারি আকারের বাগান থেকে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ মণ আম উৎপাদন
হয়। বর্তমানে জমির ইজারা, সার, কীটনাশক, শ্রমিক, পরিবহন ও প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খরচ
বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজি আম মোকামে পৌঁছাতে গড়ে প্রায় ৩২ থেকে ৩৪ টাকা ব্যয় হচ্ছে।
সে হিসেবে প্রতি মণ আম ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে বিক্রি হলে অনেক ক্ষেত্রেই চাষিদের
লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
নওগাঁর সাপাহারে দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের হাটে বর্তমানে হিমসাগর আম প্রতি মণ ৯০০
থেকে ১ হাজার টাকা, নাগ ফজলি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, গুটি আম ১ হাজার
২০০ টাকা, আম্রপালি ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা এবং ল্যাংড়া জাতের আম প্রায় ১ হাজার
টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান বাজারদরে অধিকাংশ চাষিই প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন
না বলে জানিয়েছেন।
সাপাহার উপজেলার পাকুড়ডাঙ্গা গ্রামের আমচাষি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে
আম্রপালির বাগান করেছি। প্রতি বিঘায় সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিক, পরিচর্যা ও আম
সংগ্রহসহ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘা থেকে ৫০ থেকে ৬০ মণ আম
পাওয়ার আশা করছি। বর্তমান দরে বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ হতে
পারে।
একই উপজেলার সরদারপাড়া এলাকার চাষি আনিছুর রহমান বলেন, ‘এ বছর গাছে আমের পরিমাণ
তুলনামূলক কম। গত বছর মৌসুমের শুরুতে আম্রপালি ১ হাজার ৫০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা
মণ দরে বিক্রি করেছি। এ বছর দাম কিছুটা কম। ৩ হাজার টাকার নিচে আম্রপালি বিক্রি হলে
উৎপাদন খরচ তুলতে কষ্ট হবে।’
বদলগাছী উপজেলার আমচাষি মোস্তাকিম বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে নাগ ফজলি চাষ করেছি। প্রতি
বিঘায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ৪০ থেকে ৫০ মণ আম পাওয়ার আশা করছি। বর্তমান
বাজারদরে খুব বেশি লাভ নেই। তবে মৌসুমের শেষ দিকে দাম বাড়লে কিছুটা ভালো লাভ পাওয়া
যাবে। রপ্তানি বাড়ানো গেলে চাষিরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।’
সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন,
‘সাপাহারের আমের হাটে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার আম কেনাবেচা
হয়। কিন্তু বর্তমানে সার, কীটনাশক, জমির ইজারা, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে।
ফলে বর্তমান বাজারদরে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাচ্ছেন না। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায়
সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘আমের
রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।
বর্তমানে সীমিত পরিসরে হলেও কিছু রপ্তানিকারক সরাসরি বাগানিদের সঙ্গে কাজ করছেন।
ফ্রুট ব্যাগিং করা আম বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় এসব আমের
দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন আম উৎপাদনে
কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।’











