গাজীপুরের টঙ্গীর একটি অভিজাত রিসোর্টের চার তলার একটি বিলাসবহুল কক্ষ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কয়েকজন তরুণ হয়তো ছুটি কাটাতে এসেছেন। কিন্তু সেই কক্ষের ভেতরে নিস্তব্ধতার আড়ালে চলছিল এক ভিন্ন কর্মযজ্ঞ। টেবিলজুড়ে সাজানো সত্তরটিরও বেশি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর থরে থরে সাজানো হাজার হাজার সিম কার্ড। কোনো প্রথাগত জুয়ার আসরের মতো এখানে তাসের বোর্ডে টাকা উড়ছিল
গাজীপুরের টঙ্গীর একটি অভিজাত রিসোর্টের চার তলার একটি বিলাসবহুল কক্ষ। বাইরে থেকে
দেখলে মনে হবে কয়েকজন তরুণ হয়তো ছুটি কাটাতে এসেছেন। কিন্তু সেই কক্ষের ভেতরে
নিস্তব্ধতার আড়ালে চলছিল এক ভিন্ন কর্মযজ্ঞ। টেবিলজুড়ে সাজানো সত্তরটিরও বেশি
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর থরে থরে সাজানো হাজার হাজার সিম কার্ড। কোনো প্রথাগত জুয়ার
আসরের মতো এখানে তাসের বোর্ডে টাকা উড়ছিল না, কিংবা ছিল না কোনো ক্যাসিনো চিপস।
অথচ, প্রতি মুহূর্তে এই ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকটি ডিভাইসের মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছিল
কোটি কোটি টাকা। গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার একটি সংঘবদ্ধ
চক্রের ছয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের
(ডিএমপির) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এ সময় মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে
যুক্ত ৬ হাজার ৬০০টি সিম কার্ডও জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। পরে সেই অর্থ
ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক
সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি
বলেন, টঙ্গীর একটি রিসোর্ট এবং কুমিল্লার একটি হোটেলে আলাদা অভিযান চালিয়ে
সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলেন আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২),
আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।
যেভাবে শুরু হলো ‘অপারেশন টঙ্গী টু কুমিল্লা’: গত কয়েক মাস ধরেই ডিবির সাইবার
ক্রাইম অ্যান্ড নজরদারি ইউনিটের রাডারে আসছিল কিছু সন্দেহজনক আইপি অ্যাড্রেস এবং
অস্বাভাবিক মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য। সাধারণ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ
লাখ টাকা এমন কিছু নম্বরে যাচ্ছিল, যেগুলোর কোনো বৈধ ব্যবসায়িক ভিত্তি নেই।
সাইবার নজরদারি জোরদার করতেই গোয়েন্দারা দেখতে পান, বাংলাদেশে বসে বেশ কয়েকটি
আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ পরিচালনা করা হচ্ছে। এই জুয়ার
প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা জমা দেওয়ার (ডিপোজিট) এবং তোলার (উইথড্র) জন্য ব্যবহার করা
হচ্ছিল দেশীয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) অ্যাকাউন্ট।
গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিবির দল প্রথমে হানা দেয় টঙ্গীর একটি রিসোর্টে।
সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরিফুল ইসলাম রিফাতসহ তিনজনকে। তাদের ল্যাপটপ এবং
মোবাইল স্ক্রিন তখনো সচল ছিল এবং লাইভ ট্রানজেকশন চলছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর
পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি দল রওনা দেয় কুমিল্লার একটি হোটেলের
উদ্দেশ্যে। সেখানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আরও তিনজনকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, হোতা রিফাত অত্যন্ত চতুর। তার বিরুদ্ধে আগে
থেকেই বিভিন্ন থানায় চারটি সাইবার ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে
তিনি ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করতেন এবং বিলাসবহুল রিসোর্টে একাধিক রুম ভাড়া নিয়ে
সাময়িকভাবে তার ‘কন্ট্রোল রুম’ স্থাপন করতেন।
৬৬০০ সিমের সমান্তরাল ব্যাংকিং সাম্রাজ্য: এই অভিযানের সবচেয়ে চোখ কপালে তোলার মতো
আবিষ্কার ছিল বিপুল পরিমাণ সিম কার্ড। একজন সাধারণ নাগরিকের নামে যেখানে সর্বোচ্চ
১৫টি সিম কার্ড তোলার নিয়ম, সেখানে এই চক্রের কাছে পাওয়া গেছে ৬,৬০০টি সচল সিম
কার্ড, যেগুলো সচল এমএফএস অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়া আরও ৬৭টি অতিরিক্ত
সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
এত সিম তারা পেল কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করত: তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি মূলত
গ্রাম ও শহরের নিম্নবিত্ত বা অসচেতন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে
কিংবা কিছু অসাধু সিম বিক্রেতার সহায়তায় ভুয়া বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের মাধ্যমে এই
সিমগুলো সংগ্রহ করেছিল।
সিম ব্যবহারের কৌশল ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল: ৬৬০০টি সিমকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ
করা হয়েছিল। কিছু সিম ব্যবহার করা হতো শুধুমাত্র জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার
জন্য (ক্যাশ-ইন), কিছু সিম ব্যবহার করা হতো টাকা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য
অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য, আর কিছু সিম নির্দিষ্ট রাখা হতো চূড়ান্ত
ক্যাশ-আউটের জন্য।
হাতে লেখা খাতার রহস্য: প্রযুক্তির চরম শিখরে থেকেও এই চক্রটি তাদের দৈনিক হিসাবের
খাতা রাখত অ্যানালগ পদ্ধতিতে। জব্দ করা নথির মধ্যে পাওয়া গেছে বড় বড় রেজিস্টার
খাতা। সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রতিদিনের হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের নম্বর
এবং লেনদেনের পরিমাণ লিখে রাখা হতো। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ট্রেইল এড়াতেই তারা এই
সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করত।
কোটি কোটি টাকা পাচারের রুট: ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, জব্দ ডিভাইসগুলোর
ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে—এই চক্রটি দৈনিক প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। মাসে
যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা! কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের টাকা বাংলাদেশে
থাকত না। স্থানীয় মুদ্রা বা টাকাকে তারা অভিনব উপায়ে পাচার করে দিত। জুয়াড়িরা
মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টাকা জমা দেয়। এই টাকা ৬৬০০টি এমএফএস সিমের
মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জমা হয়। মাঠ পর্যায়ের এজেন্টরা এই টাকা ক্যাশ-আউট করে
নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করে। সেই টাকা দিয়ে দেশের অবৈধ
ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেট বা পিটুপি (P2P) প্ল্যাটফর্ম থেকে USDT বা অন্যান্য
ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে এই
অর্থ চলে যায় আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায়, খুব সহজেই দেশের টাকা
বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছিল এবং দেশের রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগছিল।
নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড: এই অভিযানের সবচেয়ে বড় উন্মোচন হলো এর আন্তর্জাতিক সংযোগ।
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি আসলে এ দেশের কেউ নয়।
বাংলাদেশে যে সমস্ত অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ (যেমন ১এক্সবেট, মেলবেট ইত্যাদি)
সক্রিয় রয়েছে, সেগুলোর পেছনে রয়েছে বড় বড় আন্তর্জাতিক চক্র। এই পেমেন্ট গেটওয়ে ও
মূল সার্ভারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন চীনা নাগরিকেরা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা
গেছে, এই চক্রের মূল হোতা ‘নাতান’ নামের এক চীনা নাগরিক। সে মূলত নেপথ্যে থেকে পুরো
নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করত। এই দেশীয় এজেন্টদেরকে সে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা
কমিশনের লোভ দেখিয়ে কাজে লাগাত। আমরা নাতানকে গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা
চালাচ্ছি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থার সহযোগিতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছি। চীনা
চক্রটি মূলত বাংলাদেশিদের সরলতা এবং সহজ উপায়ে ধনী হওয়ার লোভকে পুঁজি করে এই জাল
বিস্তার করেছে। তারা দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে স্থানীয় এমএফএস অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করত, যাতে জুয়াড়িদের মনে কোনো সন্দেহ না জাগে।
তারুণ্যের অবক্ষয় ও সামাজিক ঝুঁকি: এই চক্রের সদস্যদের দিকে তাকালে একটি বিষয়
স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গ্রেপ্তারদের বয়স ২০ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। এই বয়সে যখন তাদের
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বা ক্যারিয়ার গড়ার কথা, তখন তারা জড়িয়ে পড়েছেন আন্তর্জাতিক
অর্থ পাচার ও জুয়া সিন্ডিকেটের সাথে।
সহজে বড়লোক হওয়ার নেশা, বিলাসবহুল জীবনযাপনের লোভ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো আধুনিক
প্রযুক্তির অপব্যবহার এই তরুণদের অপরাধের চোরাবালিতে টেনে নামিয়েছে। শুধু এই
তরুণরাই নয়, এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ নিঃস্ব হচ্ছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে
চুরি, ছিনতাই বা পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধে।
নীতিগত দুর্বলতা ও করণীয়: এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত, টেলিকম
সেক্টর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
সিম কার্ডের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কি ব্যর্থ? একজন ব্যক্তির নামে যেখানে ১৫টি সিমের
সীমা রয়েছে, সেখানে একটি চক্রের কাছে ৬৬০০টি সচল সিম থাকা প্রমাণ করে যে
বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ফাঁকফোকর রয়েছে। রিটেইলার বা সিম
বিক্রেতাদের কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে এই জালিয়াতি বন্ধ করা অসম্ভব।
এমএফএস নজরদারির অভাব: একসাথে এতগুলো সিম থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হওয়া
সত্ত্বেও স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কেন এগুলো আগে ব্লক করা গেল না? মোবাইল
ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেমকে আরও আধুনিক ও কঠোর
করতে হবে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি অবৈধ হলেও অনলাইনের
মাধ্যমে এর বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। পিটুপি (P2P) ট্রেডিং বা ক্রিপ্টো কেনাবেচার
প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্লক বা কঠোর নজরদারিতে না রাখলে টাকা পাচার রোধ করা কঠিন হবে।
টঙ্গী ও কুমিল্লার এই অভিযানটি কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ডিবির এই সফলতা প্রশংসনীয়
হলেও, এটি আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে অপরাধের ধরন এখন আর অ্যানালগ নেই। অপরাধীরা
এখন প্রযুক্তির ঢাল ব্যবহার করে ঘরে বসেই দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
যতক্ষণ না পর্যন্ত অবৈধ সিম বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে, এমএফএস সেবাদাতা
প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি
হচ্ছে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই অদৃশ্য ক্যাসিনোর থাবা থেকে দেশের তরুণ সমাজ ও অর্থনীতিকে
পুরোপুরি মুক্ত করা কঠিন হবে। নাতানের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং
তাদের দেশীয় দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন সময়ের বড় দাবি।











