বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধস, নতুন মূলধন কমেছে ৭০ শতাংশ

বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধস, নতুন মূলধন কমেছে ৭০ শতাংশ

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একেবারে নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রাকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে একেবারে নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ এক বছরের

ব্যবধানে ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও নতুন

কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রাকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট বিদেশি

বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলারে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায়

৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। গত বছরের এই প্রথম তিন মাসে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯

কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের

অন্তঃপ্রবাহ (ইনফ্লো) হয়েছে ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, বিপরীতে বহিঃপ্রবাহ (আউটফ্লো)

হয়েছে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো নতুন মূলধন বিনিয়োগের

চিত্র। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৯ কোটি ৫৬ লাখ

ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। এ ছাড়া আন্তঃপ্রতিষ্ঠান

ঋণের প্রবাহও প্রায় ৯২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের

অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য পুনঃবিনিয়োগের চেয়ে নতুন মূলধন আসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ,

কারণ এটিই প্রমাণ করে যে নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা দেশটির বাজারে নতুন কারখানা বা

ব্যবসায়িক প্রকল্প শুরু করতে কতটা আগ্রহী।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নতুন বিনিয়োগের এই ধসের পেছনে জাতীয় নির্বাচন

কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতাকে প্রধান কারণ

হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি

বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং মুদ্রার বিনিময় হারের

ওপর বিশেষ নজর দেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর নেতিবাচক

মূল্যায়ন, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অর্জিত মুনাফা সহজে নিজ দেশে ফেরত

নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থায় বড় ধরনের ফাটল

ধরিয়েছে। যদিও বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ (৬৫ কোটি

৩২ লাখ ডলার) দেশে পুনঃবিনিয়োগ করেছে, কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীর অভাব সামগ্রিক

শিল্পায়নের চাকাকে মন্থর করে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল

অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ বর্তমানে উগান্ডা, ঘানা ও

কঙ্গোর মতো অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের

বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানা ও উগান্ডার মতো

দেশগুলো ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, কর কাঠামো সহজীকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক

অঞ্চল সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মূলধন টানতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে

বাংলাদেশ এখনও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জ্বালানি সংকটের

মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, যা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বহুগুণ

বাড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে খাতভিত্তিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পুঁজি এসেছে বিদ্যুৎ

খাতে, যার পরিমাণ ৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। এরপর বস্ত্র ও পোশাক এবং বাণিজ্যিক খাতে

বিনিয়োগের আধিক্য দেখা গেছে। বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর,

যেখান থেকে মোট নিট এফডিআইয়ের ১৮ শতাংশ এসেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে হংকং,

নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্য। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (ইজেড)

বিনিয়োগের হার ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক, মাত্র ৪২ লাখ ডলার। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু

নগদ প্রণোদনা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; বরং আর্থিক খাতের সংস্কার, আইনি

নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বিদেশি বিনিয়োগে পুনরায়

গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos