সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও উজানের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে পাঁচ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আরও পাঁচ জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সর্বশেষ পানি সমতল পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এদিকে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর
সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও উজানের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি
বাড়তে থাকায় নতুন করে পাঁচ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আরও পাঁচ
জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সর্বশেষ পানি সমতল পরিস্থিতি
প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এদিকে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর পানি নামতে শুরু
করলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার সাড়ে সাত লাখের বেশি
মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বান্দরবানে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ আরও তিন দিন
বাড়িয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারি বর্ষণ আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের বন্যা
পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। জেলার রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় মনু ও ধলাই নদীর
প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে কক্সবাজার,
চট্টগ্রাম, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
অন্যদিকে ফেনী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় বন্যার আশঙ্কা
রয়েছে।
নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়মিত
পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে বন্যা
পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
কেন্দ্রটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে ভারী থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের
উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট,
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার কিছু স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা
রয়েছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও যমুনার পানি বাড়ছে। তবে উভয় নদীই
বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ দিনে এ অববাহিকায় ভারি
বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় পানি কিছুটা কমলেও কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ ও মারকুলি
পয়েন্ট সতর্কসীমায় রয়েছে। আগামী দুই দিনে এ অঞ্চলের পানি আবার বাড়তে পারে।
উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্ট সতর্কসীমায় রয়েছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার
নদীর পানি আগামী দুই দিনে বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও
মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর
পানি কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় বিপৎসীমা
অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা
রয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানিও বাড়তে পারে।
আগামী ৭২ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও
ময়মনসিংহ জেলার কিছু নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৭ লাখ মানুষ: প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর পানি
নামতে শুরু করলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকালে
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় যে তথ্য দিয়েছে, তাতে বিভিন্ন উপজেলার
সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া,
চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা
জানিয়েছিলেন, প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮
হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন লোক বন্যা আক্রান্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মোট ১০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের
তরফে জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভিন্ন উজেলার মধ্যে সাতকানিয়া উপজেলা সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হওয়ার কথা
বলেছেন জেলা প্রশাসক। এ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রত্যেকটি গ্রাম
প্লাবিত হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় ইউএনও মাহমুদুল বলেন, সাতকানিয়া উপজেলার পৌরসভার পানি
নামতে শুরু করেছে। তবে পৌরসভাসহ বিভিন্ন দিক থেকে পানি নামলেও সেগুলো অন্যদিকে গিয়ে
পড়ছে। যার কারণে পরিস্থিতিটি অনেকটা জটিল।
সাতকানিয়ার বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাতকানিয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে
পাহাড়ে বৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। সাঙ্গু নদী, ডলু ও হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল
নেমে আসে উজানের দিকে। বান্দরবানের দিকে বৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়বে সাতকানিয়া
অঞ্চলে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ তথ্য মতে, শুক্রবার (১০ জুলাই)
সন্ধ্যা ৬টায় পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর
দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ছিল ১৪ সেন্টিমিটার।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার বিকাল থেকে বিভিন্ন গ্রাম বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু
স্থানে বিদ্যুৎ এলেও অনেক স্থানে নেই। সবমিলিয়ে বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মধ্যে রয়েছে।
পাশাপশি ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কও পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউএনও মাহমুদুল বলেন, বিদ্যুতের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে। অনেকের
মোবাইলে চার্জ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বাঁশখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে
দিয়ে পানি সরানোর হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলার
১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে কমবেশি সবগুলো ইউনিয়নের লোকজন পানিবন্দি হয়েছে। দুপুরের পর
থেকে পানি কমতে শুরু করেছে।
বাহারছড়া, সরল, শেখের খিল, বৈলছড়ি ও কাথারিয়া ইউনিয়নের এখনও পানি রয়ে গেছে বলে
জানান তিনি।
উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন বলেন, গতরাতে বৃষ্টির কারণে অনেক
এলাকায় আবার পানি বেড়েছে। যার কারণে অনেকেই আবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকাল পর্যন্ত অন্তত ৫৫ হাজার লোক উপজেলাটিতে পানিবন্দি হয়েছেন
বলে জানান সহকারী কমিশনার আঁকন, যা বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ছিল ৩৮ হাজারের মত।
এদিকে দুর্যোগ মোকবেলিয়া ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য
দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়।
বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ: টানা ভারি বৃষ্টির কারণে
বান্দরবানে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ আরও তিন দিন বাড়িয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত
নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) রাতে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত জারি করা এক
গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি বান্দরবানে অব্যাহত ভারি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন
স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঝুঁকির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান আবহাওয়াজনিত
পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিবেচনায় পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করার জন্য ৮ জুলাই জারি করা জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির ধারাবাহিকতায় বান্দরবান
জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সিলেটে নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা: টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা
ঢলে সিলেটের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার কয়েকটি পয়েন্টে
পানির উচ্চতা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। আগামী কয়েক দিন উজানে ভারি থেকে অতিভারি
বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সীমান্তবর্তী এলাকাসহ জেলার নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা
(ফ্লাশ ফ্লাড) দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
তবে এখন পর্যন্ত জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। শুক্রবার (১০ জুলাই)
বিকেল সোয়া ৩টায় পাউবোর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১৪
দশমিক ৫৬ মিটার, যা বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি। সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানির
সমতল ছিল ১২ দশমিক ৪১ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। সিলেট পয়েন্টে
বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটারের বিপরীতে পানির সমতল ছিল ৯ দশমিক ৬৮ মিটার। সকাল থেকে
বিকেল পর্যন্ত কানাইঘাট পয়েন্টে পানি শূন্য দশমিক ০১ মিটার কমলেও সিলেট পয়েন্টে
শূন্য দশমিক ০৩ মিটার বেড়েছে। এছাড়া সারিগোয়াইন নদীর সারিঘাট পয়েন্টে পানির সমতল
ছিল ১০ দশমিক ২৭ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৩৫ মিটার। গোয়াইনঘাট পয়েন্টে
বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮২ মিটারের বিপরীতে পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৫৪ মিটার। পিয়াইন
নদীর জাফলং পয়েন্টে পানির সমতল ছিল ৯ দশমিক ৮৯ মিটার। অন্যদিকে লোভাছড়া নদীর লোভা
পয়েন্ট এবং ধলাই নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে পানির উচ্চতা কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ
বলেন, আগামী কয়েক দিন ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের
পূর্বাভাস রয়েছে। এর প্রভাবে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেটের নদ-নদীর পানির স্তর
আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা
রয়েছে।
মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি
হয়েছে। জেলার রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং
উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুই উপজেলায় অন্তত ৫০টিরও বেশি গ্রাম ইতোমধ্যে
পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার
মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা আউশ ধানের ক্ষেত। বন্ধ ঘোষণা করা
হয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উজান থেকে ঢল নামা অব্যাহত থাকায় মনু ও কুশিয়ারা
নদীর অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী
তীরবর্তী বাসিন্দারা।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকালের পর থেকে রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর পানি বিপদসীমার
ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট
উপচে পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। বিশেষ করে কামারচাক ইউনিয়নের টুপিরমহল এলাকায়
বাঁধের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। এতে
কামারচাক ও টেংরা ইউনিয়নসহ নদী তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের হাজার হাজার মানুষ
পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, তলিয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিপুল সিকদার জানান, আমরা বুধবার রাত থেকেই
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। স্থানীয় লোকজন ও পানি উন্নয়ন
বোর্ডের সহায়তায় বালুর বস্তা ফেলে বাঁধের ফাটল মেরামতের কাজ চলছে। পানিবন্দি
মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত
হওয়ায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে কমপক্ষে ২৫টি গ্রাম। উপজেলার ইসলামপুর,
আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ৩-৪ ফুট পানির নিচে। স্থানীয় সূত্র
জানায়, মোকাবিল ও গঙ্গানগর এলাকায় বাঁধের বড় অংশ ধসে পড়ায় লোকালয়ে তীব্র গতিতে পানি
প্রবেশ করছে। ইসলামপুর-আদমপুর প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বন্যার পানিতে ভান্ডারীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়সহ কমপক্ষে ৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি
প্রবেশ করায় পাঠদান ও চলমান পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে
কর্তৃপক্ষ। বাঁধ ভাঙনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিকে দায়ী করে তীব্র ক্ষোভ
প্রকাশ করছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
ভয়াবহ এই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে মৌলভীবাজার জেলা
প্রশাসন। দুর্গত মানুষদের জন্য জেলায় ইতোমধ্যে ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা
হয়েছে এবং পানিবন্দি মানুষকে সেখানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও ত্রাণ
বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার সদর ৩৩০ ব্যাগ রাজনগর ২১০ ব্যাগ, কমলগঞ্জ
২০৫ ব্যাগ, জুড়ী ১৫৭ ব্যাগ।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান জানান, পানিবন্দি মানুষদের
নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার পাশাপাশি শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ
কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন সার্বক্ষণিক মাঠে
রয়েছে।











