গভীর সমুদ্রের ‘রূপালি সোনা’: টুনা মাছে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

গভীর সমুদ্রের ‘রূপালি সোনা’: টুনা মাছে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বঙ্গোপসাগরের গভীরে টুনাসহ উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক মাছের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও আধুনিক জাহাজ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে সেই সম্পদ এখনো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে প্রতিবছর সম্ভাব্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী লংলাইনার জাহাজ এবং আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শুধু

বঙ্গোপসাগরের গভীরে টুনাসহ উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক মাছের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও

আধুনিক জাহাজ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে সেই সম্পদ এখনো

কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে প্রতিবছর সম্ভাব্য বিপুল বৈদেশিক

মুদ্রা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী লংলাইনার জাহাজ এবং

আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শুধু টুনা মাছ

রপ্তানি থেকেই বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ তিন হাজার কোটি টাকারও

বেশি আয় সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে ক্যানজাত টুনা মাছের ক্রমবর্ধমান চাহিদার একটি বড়

অংশ বর্তমানে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। দেশীয় উৎপাদন শুরু হলে আমদানি নির্ভরতা

কমবে এবং স্থানীয় শিল্পও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে

সরকার ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় তিনটি বিশেষায়িত লংলাইনার জাহাজ সংগ্রহ, সম্ভাব্য মৎস্যক্ষেত্র

চিহ্নিতকরণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে বেসরকারি

বিনিয়োগ বাড়লে জাহাজ পরিচালনা, মাছ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও সরবরাহ

ব্যবস্থায় হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির

মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা লাভ

করলেও সেই সম্পদের বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র

পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা (এসএসটি), ক্লোরোফিলের ঘনত্ব এবং আন্তর্জাতিক

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল

(ইইজেড) এবং আন্দামান সাগরসংলগ্ন গভীর সমুদ্রকে টুনা আহরণের সবচেয়ে সম্ভাবনাময়

এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ইয়েলোফিন, স্কিপজ্যাক, বিগআই ও

লংটেইলসহ টুনা ও টুনাসদৃশ একাধিক প্রজাতির মাছের উপস্থিতি রয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের

তথ্য অনুযায়ী, যেখানে শ্রীলঙ্কা বছরে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৯৪ মেট্রিক টন এবং ভারত ৫২

হাজার ২২ মেট্রিক টন টুনা ও বিলফিশ আহরণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের আহরণ মাত্র ১৪

হাজার ৫০০ মেট্রিক টন, যার অধিকাংশই মূলত ট্রলারের পার্শ্ব-আহরণ (বাইক্যাচ)।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির সবচেয়ে

বড় অপ্রয়োগিত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো গভীর সমুদ্রে টুনা আহরণ। সংস্থাটির হিসাব

অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০টি আধুনিক লংলাইনার জাহাজের বহর গড়ে তোলা গেলে

বছরে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন টুনা আহরণ সম্ভব হবে, যা থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন

মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হতে পারে। প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ১০টি জাহাজের একটি

বাণিজ্যিক বহর গড়ে তুললেও পাঁচ বছরের মধ্যে সেই বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে বলে ধারণা

দেওয়া হয়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুণ জানিয়েছেন,

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন খাত হওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি,

বিশেষায়িত জাহাজ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এ কারণে জাপানসহ কয়েকটি দেশের

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ইতোমধ্যে দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান গভীর

সমুদ্রে মাছ ধরার উপযোগী জাহাজ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টুনা আহরণের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু মাছ ধরার জাহাজই যথেষ্ট

নয়; আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ক্যানিং কারখানা, মান

নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি ও রপ্তানি অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে

কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী-সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ এবং

খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলকে সামুদ্রিক মাছ চাষ, সামুদ্রিক শৈবাল, ঝিনুক ও কাঁকড়া চাষের

কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও বড় সুযোগ রয়েছে। পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে আধুনিক

প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে গভীর সমুদ্রের এই

‘রূপালি সোনা’ বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে

পারে এবং রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos