বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল মাধ্যম হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এখন বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে এই খাতে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রধান ১০টি রপ্তানি বাজারের মধ্যে ৯টিতেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। শুধুমাত্র স্পেন ছাড়া
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল মাধ্যম হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এখন বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে এই খাতে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রধান ১০টি রপ্তানি বাজারের মধ্যে ৯টিতেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। শুধুমাত্র স্পেন ছাড়া অন্য সব বৃহৎ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তালিকায় দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় মোট ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে এক বছরে মোট আয় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমেছে। বিভাগীয় বিশ্লেষণে জানা গেছে, নিটওয়্যার খাতে আয় কমেছে ১৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ওভেন খাতের আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে অগ্রগতির হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে, যেখানে হার ১৪ শতাংশ। ফ্রান্স ও ইতালিসহ অন্যান্য বড় বাজারের রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ২৬ ও ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। ডেনমার্কেও রপ্তানি তেমন উন্নতি হয়নি, যেখানে হার ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা অর্থনৈতিক মূল্যায়নে আদায় হয়েছে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়নে। এছাড়াও, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও জাপানের বাজারেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। একমাত্র স্পেনে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের জন্য মূলত অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা প্রতিকূলতাকে দায়ী করে। দেশের উৎপাদন খরচ বেপরোয়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তদ্ব্যতীত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জটিলতাসহ ব্যবসায়ীদের পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছানোর লিড টাইম বাড়ছে, যার ফলে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। মার্কিন ও ইউরোপীয় শুল্ক নীতির কারণে আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়াও বড় একটি কারণ। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব তো রয়েছেই, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরির ফলে বাংলাদেশেও ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে কারখানা চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে, পাশাপাশি পরিবহনের খরচও অনেক বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত দুর্বলতা রপ্তানি বাণিজ্যের স্থবিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি এখনো আগের মতো উন্নত না হওয়ায় মারাত্মক ধাক্কা লাগতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনীতির ওপর। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিকল্প বাজার অনুসন্ধান এবং জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করছে বিশ্লেষকরা। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে শেখের পোশাক শিল্প।











