বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে এখনো কিছু নীতিগত সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)। এছাড়া এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন মনে করছেন সংস্থাটির গবেষকরা। মঙ্গলবার (১০ মার্চ)
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে এখনো কিছু নীতিগত সুযোগ
রয়েছে বলে মনে করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি)। এছাড়া এ পরিস্থিতি
মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
নিশ্চিত করা। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ
বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন মনে করছেন সংস্থাটির
গবেষকরা।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৬–২৭
অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিপিডির পরামর্শ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের
প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন
করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা
পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সংস্থাটি মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে
বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে
অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে নীতি–উপকরণ ব্যবহার
করে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন
বিশেষজ্ঞরা।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম
বাড়লেও সেটি স্থানীয় বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সরকারের
নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশে জ্বালানির ওপর প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বিভিন্ন
ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এসব কর কমিয়ে সরকার অভ্যন্তরীণ
বাজারে চাপ কমাতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়
জ্বালানি আমদানিতে আরোপিত ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানির কয়েক
সপ্তাহের মজুত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো—এখানে কোনো স্থায়ী কৌশলগত
জ্বালানি মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ নেই, যা অনেক প্রতিবেশী দেশে রয়েছে। এমন
রিজার্ভ থাকলে সংকটের সময় বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হতো।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কে বেশি করে জ্বালানি কিনে মজুত করার
প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ‘প্যানিক বায়িং’ বেড়ে গেলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, যা
তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেওয়া কঠিন। তাই বাজারে আস্থা তৈরি করা এবং সরবরাহের নিশ্চয়তা
দেওয়া জরুরি।
বর্তমানে সরকার জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পট মার্কেট থেকে তেল কিনছে এবং
ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তি পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ
নিচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি
আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত
চাপ না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রিজার্ভের ওপর খাদ্য নিরাপত্তা ও সার আমদানির
মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট
ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে একটি কৌশলগত জ্বালানি রিজার্ভ
গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। এতে ভবিষ্যতে বাজারে স্থিতিশীলতা থাকবে এবং প্যানিক
বায়িংয়ের ঝুঁকিও কমবে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে চলতি অর্থবছরেই সরকার
প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর
পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করছে, এই চুক্তির ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার
সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দিতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের
অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে
শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০
ধরনের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে।
তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে চলতি অর্থবছরেই সরকার আমদানি শুল্ক থেকে প্রায় ১ হাজার
৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে। তিনি আরও বলেন, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে
একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ডব্লিউটিও-এর নীতির সঙ্গে
সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে
বাধ্য হতে পারে বাংলাদেশ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার
শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তির প্রভাব—বিশেষ করে রাজস্ব আয়
ও সরকারি ব্যয়ের বিষয়টি—পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে আবার আলোচনা করা উচিত।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই নানা
চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব
ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ
প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট।
তাই এটি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে তারা নির্বাচনী
অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের
দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব দেখাতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান অস্থিরতা
মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার
কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি জোর দেন।











