ইরানে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে কুর্দিরা

ইরানে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে কুর্দিরা

ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘খাবাত অর্গানাইজেশন’-এর সেক্রেটারি জেনারেল বাবাশেখ হোসেইনি জানিয়েছেন, ইরানে একটি স্থল অভিযান পরিচালনার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বর্তমানে কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান না চললেও দীর্ঘ সময় ধরে এর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। হোসেইনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অভিযানের জন্য অত্যন্ত অনুকূল এবং শীঘ্রই তারা এই

ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘খাবাত অর্গানাইজেশন’-এর সেক্রেটারি

জেনারেল বাবাশেখ হোসেইনি জানিয়েছেন, ইরানে একটি স্থল অভিযান পরিচালনার জোরালো

সম্ভাবনা রয়েছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বর্তমানে কোনো

আক্রমণাত্মক অভিযান না চললেও দীর্ঘ সময় ধরে এর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। হোসেইনি মনে

করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অভিযানের জন্য অত্যন্ত অনুকূল এবং শীঘ্রই তারা এই পথে

হাঁটতে পারেন।

হোসেইনি আরও জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী এবং কুর্দি

চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি

বৈঠক হয়নি, তবে ওয়াশিংটন বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থা মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে

সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, এই যোগাযোগগুলো মূলত কুর্দি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে

এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উন্নত সমরাস্ত্রের অভাবকে চিহ্নিত

করেছেন এই কুর্দি নেতা। তিনি জানান যে তাদের কাছে বর্তমানে অত্যন্ত সাধারণ এবং

পুরনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ড্রোন বা উন্নত বিস্ফোরকের মতো আধুনিক সরঞ্জামের

প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি কোনো

সহযোগিতা গড়ে ওঠে, তবে তাদের প্রধান দাবি হবে উন্নত অস্ত্র সহায়তা। মাঠপর্যায়ে বড়

কোনো পরিবর্তন আনতে হলে এ ধরনের আধুনিক সরঞ্জামের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মনে

করেন।

‘কুর্দিরা ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে গুঁড়িয়ে দিব’

কুর্দিরা ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে তাদের ধ্বংস করে

দেওয়া হবে বলে হঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস

(আইআরজিসি)।

শনিবার তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কাতার ভিত্তিক গণমাধ্যম

আল-জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা আজ শনিবার সকালে ইরাকের

কুর্দি–অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কুর্দিদের তিনটি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা

চালিয়েছে।

বিবৃতিতে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো

ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তাদের গুঁড়িয়ে দেওয়া

হবে।

এর আগে ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বাহিনী জানিয়েছে, তারা সশস্ত্র ইউনিট প্রস্তুত

করছে। এই ইউনিট প্রয়োজনে ইরানে পাঠানো হবে। এর আগে খবর বেরিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে ইরানে পাঠানোর পরিকল্পনা

করছে। যদিও হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, কুর্দিদের দিয়ে ইরানে বিদ্রোহ শুরুর কোনো

পরিকল্পনা তাদের নেই। কিন্তু অতীতের ঘটনাগুলো বলছে, সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটির সঙ্গে

ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এমনকি কাজ শেষে পরিত্যাগ করার অভিযোগও আছে।

কুর্দি কারা?

কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় জাতিগোষ্ঠী। তাদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি বলে ধারণা

করা হয়। ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা

স্বাধীন রাষ্ট্র কিংবা স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছে।

কুর্দিরা কি পারবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে

ইরানে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর দেশটির

কুর্দি জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে

করছেন, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী কুর্দিরা হয়তো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে

বিদ্রোহের সম্ভাব্য শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, এই গোষ্ঠীর পক্ষে দ্রুত

ও সফল সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত।

খবরে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।

এমনকি গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকি কুর্দি

নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধারণা

করা হচ্ছে, ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে বিদ্রোহে

উসকে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে—যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত

করা হয়নি।

ইরানের কুর্দিদের অবস্থান

ইরানে কুর্দিদের সংখ্যা আনুমানিক এক থেকে দেড় কোটি। তারা মূলত দেশের

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশে বসবাস করে, যা ইরাক ও তুরস্কের কুর্দি অধ্যুষিত

অঞ্চলের সন্নিকটে। তবে ইরাক বা সিরিয়ার কুর্দিদের তুলনায় ইরানের কুর্দিরা

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে। সাম্প্রতিক

বছরগুলোতে অবশ্য তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে। ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী

মাশা আমিনি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুবরণ করলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ‘নারী, জীবন,

স্বাধীনতা’ স্লোগানে সেই আন্দোলন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং কুর্দি

অঞ্চলগুলোতে এর তীব্র প্রভাব ছিল।

ইরানের কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিকভাবেই কুর্দি আন্দোলন নিয়ে সতর্ক। তাই কুর্দি অধ্যুষিত

এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সব সময়ই বেশি। ২০২৫ সালের শেষদিকে এবং চলতি

বছরের শুরুতে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তাতেও কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কঠোর দমনপীড়নের

অভিযোগ ওঠে।

ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা

সম্প্রতি উত্তর ইরাকে রাজনৈতিক সদর দপ্তর থাকা পাঁচটি কুর্দি সংগঠন একটি ঐক্যফ্রন্ট

গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসান এবং কুর্দিদের

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

এই জোটে দুটি সংগঠন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর একটি হলো—কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক

পার্টি, অন্যটি ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তান। এই দুটি সংগঠনের নিজস্ব সশস্ত্র

শাখাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ অনেকটা ১৯৯০-এর দশকে সাদ্দাম হুসেইন

সরকারের বিরুদ্ধে ইরাকি কুর্দিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মতো।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধাও সামনে এসেছে। উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল

‘কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার’ (কেআরজি) ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার

করে কোনো সামরিক অভিযান চালানো যাবে না। কারণ অতীতে ইরান এই অঞ্চলে কুর্দি

বিদ্রোহীদের উপস্থিতির অভিযোগে গোলাবর্ষণ করেছে।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে

বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকের দুই প্রধান কুর্দি নেতা—মাসউদ

বারজানি এবং বাফেল তালাবানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই নেতাদের আঞ্চলিক কুর্দি

রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ইরানি

কুর্দিদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন এবং অস্ত্র সরবরাহের কথাও ভাবা হচ্ছে।

বর্তমানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের নিরাপত্তা অবকাঠামো—পুলিশ স্টেশন,

বিপ্লবী গার্ডের ঘাঁটি এবং স্থানীয় মিলিশিয়া কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে একটি কার্যকর বিদ্রোহ গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে। নতুন

যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠন গঠন এবং সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে মাস নয়, বরং বছরও

লাগতে পারে।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos