১০ বছর ধরে হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এক তরুণের অবদান অব্যাহত

১০ বছর ধরে হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এক তরুণের অবদান অব্যাহত

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের লাঙ্গলজোড় গ্রামে একটি আদিবাসী হাজং পরিবার তাদের আঙিনায় পাটি পেতে বসে ছিল শিশু থেকে বড় পর্যন্ত নানা বয়সী মানুষ। সবাই এক সহোদর বক্তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। বক্তা তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন—‘চড়ুই পাখিকে হাজং ভাষায় কী বলা হয়?’ অনেকেরই জবাব জানা ছিল না। এরপর তিনি নিজেই জানিয়ে দেন—‘চড়ুই পাখিকে হাজং

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের লাঙ্গলজোড় গ্রামে একটি আদিবাসী হাজং পরিবার তাদের আঙিনায় পাটি পেতে বসে ছিল শিশু থেকে বড় পর্যন্ত নানা বয়সী মানুষ। সবাই এক সহোদর বক্তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। বক্তা তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন—‘চড়ুই পাখিকে হাজং ভাষায় কী বলা হয়?’ অনেকেরই জবাব জানা ছিল না। এরপর তিনি নিজেই জানিয়ে দেন—‘চড়ুই পাখিকে হাজং ভাষায় বলে আংরুক।’ বক্তার নাম অন্তর হাজং, তিনি একজন তরুণ। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার খুজিগড়া গ্রামে। তিনি মূলত ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার হাজং সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে শিশুদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধারণ ও সংরক্ষণের জন্য প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করে আসছেন। তার লক্ষ্য, হাজংদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি যেন হারিয়ে না যায়, তারা যেন মাতৃভাষায় নিজেদের ঘরে কথা বলতে পারে।

অন্তর হাজং ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। সময় পেলেই তিনি দুর্গাপুর, ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাটের হাজং বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশুদের হাজং ভাষা শেখান। এর ফলে হারিয়ে যেতে থাকা ভাষাটা কিছুটা হলেও জীবন পায়। তবে নানা ধরনের সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা না পেয়ে তার এই কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে গেছে বলে তিনি অবগত।

ধোবাউড়া ও আশেপাশের হাজং পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, অন্তর হাজং শুধু শিশukuদের ভাষা শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। তিনি হাজং শিশুদের জন্য বই, খাতা, কলমসহ নানা ধরণের শিক্ষা উপকরণ কিনে দেন। বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে তিনি হাজং পরিবারের পাশে দাড়ান, তাদের পাশে দাঁড়ানোয় তাদের অসহায়ত্ব কিছুটা হলেও কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে হাজংদের পাশে থেকে তিনি তাদের অবিচল বন্ধু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন।

অন্তর হাজং বলেন, পৃথিবীর কোন ভাষার প্রতি তার বিদ্বেষ নেই। বরং সবাই যেন মাতৃভাষার চর্চা করতে বলেন। তিনি এই তাড়নায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাজং শিশুদের ভাষা শেখান। ২০১৭ সাল থেকে তিনি এই মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, দিনে দিনে হাজং ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের বয়স্ক হাজংরা এখনো নিজেদের ভাষা বলতে পারলেও শহরে বসবাসকারী শিশুদের ভুলে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সবাই একসঙ্গে কাজ না করলে ভাষা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্তর হাজং আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও এখনো সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় কাজের তেমন গতি নেই। এজন্য তার ভাষা সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা ও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে হাজং জনসংখ্যা মোট প্রায় ১৫ হাজার। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে তিনি মনে করেন। ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার মোট ১০১টি গ্রামে হাজং পরিবার রয়েছে। এই গ্রামগুলোর সকলের ভেতরে ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গ্রামে গিয়ে তিনি স্থানীয় বয়স্ক হাজংদের কাছ থেকে ভাষা ও সংস্কৃতির অবশিষ্ট ধাপগুলো সংগ্রহ করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো সংরক্ষণ করেন। এভাবেই হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।

অন্তর হাজং এই কাজের জন্য নিজস্ব অর্থায়ন করেন—কিছুকিছু অর্থে বিশেষ কিছু সাহায্য পেলে বা স্থানীয় সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তায় তিনি আরও বেশি কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে চান।

Staff Reporter
ADMINISTRATOR
PROFILE

Posts Carousel

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos